shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

Money is a luxury lover
Money is a luxury lover

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

আফরোজা অদিতি

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

অর্থ এক মত্ত হস্তি। অর্থকে বশ করার জন্য, কাছে পেয়ে ধরে রাখার জন্য—তার পেছনে ছুটতে হয় অহরহ। ভালোবেসে মায়াডোরে বাঁধতে হয় অর্থকে, তবেই সে থাকে আঁচলে-পকেটে। অর্থকে ভালো না-বাসলে সে থাকে না কাছে, পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।

অর্থকে ভালোবাসা যাক আর না যাক, অর্থের পেছনে ছুটে বেড়ানোর জন্য তাকে হাতে পাবার জন্য এবং হাতের মুঠোয় ধরে রাখার জন্য অনেকে আছে! কেউ অর্থের পেছনে ছোটে—তাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ধরে রাখার জন্য, আর কেউ আছে তারা ছোটে না, অর্থের উপর মায়া নেই তাদের, তবে না-ছুটলেও তাদের অর্থ লাগে বৈকি। অর্থ না-হলে তো এই পৃথিবীতে মানুষ এক পা চলতে

পারে না, একমূহূর্ত চলে না!

অর্থকে যে ভালোবাসে—সেই শুধু দৌড়ায় তা নয়, যে ভালোবাসে না—তাঁকেও দৌড়াতে হয় বৈকি। যারা ছোটে না, তাদেরও কিছুটা হলে ছুটতে হয়! যেটুকু না-হলে চলে না বা যেটুকু না-থাকলে দিন যায় না, সেটুকুর জন্যই দৌড়ায়-ছোটে তারা। সেটুকু থাকলেই সন্তুষ্ট থাকে তারা।

আবার অর্থ না-থাকলে জীবন ব্যর্থ এমন ভাবনার অনেক মানুষও আছে। এমন অনেকে আছে অর্থ আঁকড়ে ধরে ভালো থাকে, প্রাণে ধরে অর্থ খরচা করতে চায় না কখনো। আবার এমন অনেকে আছে, হেলাফেলা করেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যয় করে অর্থ। 

তবে সবার জেনে রাখা ভালো যে, অর্থ এমনই এক বিলাসী প্রেমিক—যাকে বুকে ধরে ভালো না-বাসলে থাকে না কাছে। মায়াবি পরীর মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাওয়া তার ধর্ম।

যারা অর্থ প্রেমে পাগল নয়, তাদের কাছে অর্থ থাকে না কখনো; মুঠোতে ধরে রাখতে পারে না তারা। অর্থ-গদির নিবিড় গরম অনুভব করতে পারে না তারা; তাদের কাছে দেদার অর্থ আসলেও, তা জলের মতো হাতের আঙুল গলে বেরিয়ে যায়, রাখতে পারে না।

বসন্তে যেমন বৃক্ষ পত্র-পুষ্প শোভিত হয়, পাখি আসে স্বভাব গীতে মুখর করে প্রকৃতি; তারপর একসময় গান বন্ধ হয়, বৃক্ষের পাতা ঝরে যায়, তেমনি অর্থও তাদের কাছে বসন্তের পাখির মতো আসে আর চলে যায়। 

অর্থের স্বভাব যে ভালোবাসে তার কাছে থাকে সে, যে ভালোবাসে না, তার কাছে কখনো নয়! সে তার কাছে শুধু যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকে। ‘আমার প্রাণের পরে ছুঁয়ে গেল কে বসন্তেরই বাতাসটুকুর মতো’—অর্থও তাই, শুধুই ছুঁয়ে যায় তার প্রাণ বসন্ত বাতাসের মতো।

যে অর্থ ভালোবাসে না, তার কাছে অর্থ থাকে না, থাকতে চায় না। এর বিপরীত দিকও আছে, অনেকে চাহিদা মাফিক অর্থ পায় না। যখন চাহিদা মাফিক অর্থ হাতে পায় না, তখন তো ধরে রাখার প্রশ্নও ওঠে না।

দরিদ্র বা হতদরিদ্র যারা, তারা চাহিদামাফিক অর্থ চেয়েও পায় না। তারা তো ভালোবাসার মতো অর্থই পায় না। হাত পেতে থাকে; দুহাত পেতে কী কখনো পাওয়া যায় বিলাসী প্রেমিককে? যায় না!

জলের অন্য নাম জীবন, তেমনি অর্থের অপর নামও জীবন। অর্থ ও জল সমার্থক। দুটোরই প্রয়োজন আছে মনুষ্যজীবনে। দুটোই বহতা, বয়ে যাওয়া ওদের ধর্ম। তবে জল বয়ে যায় নিচের দিকে, আর অর্থ ওপরের দিকে।

অর্থ ও জল মানুষকে টান টান হতে শেখায়, মানুষের ভেতরে জীবনবোধের জন্ম দেয়। তবে এই জীবনবোধ মানুষভেদে ভিন্ন; কখনো কোথাও তা পরিচ্ছন্ন, কোথাও-বা অপরিচ্ছন্ন। জল জীবনের জন্য অবধারিত; দিনে আট গ্লাস জল হলেই জীবন থাকে টান টান। কিন্তু অর্থের পরিমাপ করা সহজ নয়!

মানুষের মৌলিক চাহিদাই হলো অর্থের মাপকাঠি। অনেকে সীমিত আয়ের অর্থে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন-নির্বাহ করে। এই অর্থে আবার তাকে জল, আলোর মূল্যও পরিশোধ করতে হয়। অর্থ ও চাহিদা সমান্তরাল, কিন্তু জল তা নয়।

জল চাহিদার সঙ্গে যেমন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তেমনি জীবনের সঙ্গেও। অর্থের সঙ্গে চাহিদার যোগ হয় যখন, তখন বাড়ে জীবনের যোগান অর্থাৎ জীবনের বিলাসিতা। চাহিদার সঙ্গে জোগানের সম্পর্ক, জোগানের সঙ্গে অর্থের ওঠা-নামার সম্পর্ক।

এই ওঠা-নামাই জীবনের স্বচ্ছলতা বা অস্বচ্ছলতা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে রাখে রজ্জুর মতো। এই রজ্জু অদৃশ্য ও শক্ত কঠিন।

‘অর্থ অনর্থের মূল’ ছোটবেলায় শুনেছি, পড়েছি। কিন্তু অর্থ কখনো অনর্থের মূল হতে পারে না, চাহিদার মূলে থাকে অর্থ, তাই অর্থের চাহিদা হলো অনর্থের মূল। যার বেশি আছে, সে যখন অর্থের জন্য ছটফট করে, যেনতেনভাবে অর্থ মুঠোয় নিতে চায়, তা উপার্জন করে ব্যাংকে জমিয়ে রাখে কিংবা অন্য দেশে পাচার করে, উল্টে-পাল্টে হিসাব কষে মনের ভেতরে নীরবসুখ অনুভব করে, তখন এই অর্থ-চাহিদাই অনর্থের মূল হয়ে দেখা দেয়।

আবার অন্যদিকে ভাবলে বা দেখলে দেখা যায়, যারা জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য অর্থ পায় না, তখন মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা) সংকুলানের জন্য অপরাধ করে; অর্থাৎ ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি করে তখনো অনর্থ ঘটে।

এই দুটো ব্যবস্থাই—যেনতেন প্রকারে অর্থ উপার্জনের পন্থা, দুটোই মানুষের চাহিদা; এই দুটোর মধ্যে একটি হলো অর্থকে ভালোবেসে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা, আর একটি হলো মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য অর্থ প্রাপ্তির চেষ্টা। একটি লোভের, আর অন্যটি প্রয়োজনের। এখন বিচার্য, দোষের কোনটি; প্রথমটি না শেষেরটি?   

সংসারের সুখের সঙ্গে চাহিদার সম্পর্ক এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং উচ্চাভিলাষ দুটোই চাহিদা। মানুষের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। চাহিদার শেষ নেই। চাহিদা যখন শুধু বেঁচে থাকার জন্য তখন ঠিক আছে, কিন্তু চাহিদা যখন উচ্চাভিলাষে রূপ নেয়, তখন মানুষের নৈতিক অবক্ষয় হয়।

সে তখন নিজের এবং তার আশেপাশের মানুষের ক্ষতি করতে দ্বিধা করে না। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের জীবনও দিয়ে দিতে পারে।

বেশ কিছুদিন আগে ‘পাখিড্রেস’ না-পেয়ে আত্মহত্যা করেছিল এক মেয়ে। তার বাবার ঐ ড্রেস দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। পাখি ড্রেস হলো টিভি সিরিয়াল ‘বুঝে না সে বুঝে না’-এর নায়িকা, ‘পাখি’র পোশাক। এটা গেল একদিক।

অন্যদিকও আছে। মানুষের চাহিদার কাছে হার মানে নৈতিকতা মূল্যবোধ। তা না-হলে বিনামূল্যে বিতরণকৃত পাঠ্যবইয়ের এই হাল ঘটতো না। ঘটতো না ব্যাংক কর্মকর্তার নির্যাতন। বিশ্বে ঘটতো না অযাচিত হামলা। সবকিছুই ঘটছে চাহিদাকে কেন্দ্র করে।

আমাদের সংসার—আমাদের বিশ্ব—আমাদের পৃথিবী—সর্বত্রই চাহিদার উর্ধ্বগতি। চাহিদার মূল লক্ষ্য ধনী হওয়া, অন্যের উপর কব্জা করা, আবার কারো কারো ভালোভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও চাহিদার মূল লক্ষ্য।

চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় অবক্ষয়। অবক্ষয় রোধ করবে শিক্ষা। সেই শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই দশা। বিনামূল্যে সরবরাহকৃত বই নিম্মমানের কাগজ বাঁধাই ভালো না, ভেতরের ছবি অস্পষ্ট। কোথাও কোথাও কবির কবিতার উলোটপালোট লাইন—যেখানে কবিতার অর্থ পাল্টে গেছে!

কেন এমন হয় বা হচ্ছে? নতুন প্রজন্মের কাছে এর জবাব কী? আমাদের নতুন প্রজন্ম কী শিখছে? মানবিকতা না ক্ষমতার অপব্যবহার! আমাদের পুরনো ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে, ঝরে যাচ্ছে তরুণ প্রাণ। এই ঝরে যাওয়া তরুণ প্রাণ কী ইতিহাস সৃষ্টি করছে। পুরনো ঐতিহ্য ভাঙচুর না সংরক্ষণ প্রয়োজন—এই শিক্ষা কে দিবে ? 

চাহিদার সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর; আগে মানুষের চাহিদা ছিল কম। অল্পে তুষ্ট ছিল মানুষ। যেটুকু নিজের, তাই নিয়েই খুশি থেকেছে মানুষ। বর্তমান যুগে তা পাল্টে গেছে। সংসারে চাহিদা থাকবে তাই বলে অবক্ষয়? অর্থ যখন বিলাসী প্রেমিক তখনই অবক্ষয়ের শুরু!

…………………

পড়ুন

কবিতা

আফরোজা অদিতির পাঁচটি কবিতা

গল্প

রাত ভোর হতে আর কত দেরি

মুক্তগদ্য

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

ভ্রমণ

গোকুল মেধ বা বেহুলার বাসরঘর

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা – ২য় পর্ব

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি – ২য় পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...