shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

বার

‘শেরপুর শ্রমিক ক্লাব’-এর পক্ষে আবদুস সাত্তার জোয়ারদারের সম্পাদনায় বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয় ‘সমর্পণ’। প্রকাশ কাল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সাল। ইউনুস প্রেস থেকে মুদ্রিত। বিনিময় মূল্য এক টাকা।

শ্রমিক শ্রেণিদের পক্ষ থেকে সাহিত্যচর্চা শেরপুরে সত্তর দশকে দেখা মিললেও, পরবর্তী সময়ে তার ধারাবাহিকতা থাকেনি। সম্পাদক লিখেছেন, ‘রুটিন বাধা জীবনে এই শ্রেণী কোনোদিন পায় না সংস্কৃতির আলো। তাই সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজে এদের স্থান নির্ধারণে শ্রমজীবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে শেরপুর শ্রমিক ক্লাব।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘শ্রমিক জাতীয় জীবনের মূলশক্তি। এই শক্তি যদি সচেতনভাবে আলোক তীর্থে নিয়ে যাওয়া না যায়, তবে জাতীয় জীবন অবধারিতভাবে হবে অন্ধকারের উৎস। ইতিহাস যতটুকু অর্জন করেছে, মানুষ যতটুকু এগিয়েছে—তার মূলে আছে শ্রমিকদের সচেতন প্রয়াস। শ্রমিকের কর্মক্ষমতার মাঝে যদি আসে অবচেতন প্রয়াস—ইতিহাসে আসে বর্বরতার যুগ।’ সম্পাদকের চমৎকার পর্যবেক্ষণ।

আবুল হোসেন লিখেছেন, ‘শ্রমিক মালিক সস্পর্কের অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রায়ই উৎপাদন বন্ধের ধর্মঘট, ঘেরাও আন্দোলন, মালিকদের পাল্টা ব্যবস্থা লে-অফ। যার ফলশ্রুতিতে জাতীয় উৎপাদন হ্রাস পায়, দেশ হয় ক্ষতিগ্রস্ত। কোম্পানির মালিক ক্ষতি পুষিয়ে নেন মূলধন অন্যত্র সরিয়ে, সরকার পুষিয়ে নেন অতিরিক্ত ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে। শুধু পুষিয়ে নিতে পারে না শ্রমিক মেহনতী জনতা। যারা দ্রব্যমূল্যের প্রাথমিক শিকার।’

এ ছাড়া লিখেছেন—এখলাস উদ্দিন, দেবাশীষ কর, কাজী মাসুদ, সাদিকুর রহমান মিরণ প্রমুখ।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

ক.

‘কখনো বস্তা মাথায়, কখনো হাতুরি

কখনো ফুটপাতে, কখনো বারান্দায়

বিরাম নেই, চাওয়া আছে; পাওয়া নেই।

না;

আর নয়—

বিপ্লব তোমাকে স্বাগতম।

(লাল সূর্য : আজাদ আলী)

খ.

কতবার আমি মিশতে চেয়েছি—

সেই মেহনতি জনতার সাথে

কিন্তু—পারিনি।

… … …

পারিনি মেহনতি জনতার সাথে

চিৎকার করে বলতে—

আমি বাঁচতে চাই।

(মেহনতী আত্মা : দেবাশীষ চক্রবর্তী)

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৮০ সালে ১ মে প্রকাশিত হয় ‘প্রলেতারিয়েত’। শ্রমিক দিবসের স্মরণিকা। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের শ্রমিক শাখার অনিয়মিত মুখপত্র। সালমা প্রিন্টিং ওয়ার্কস থেকে লেটার প্রেসে ছাপা। এ সংখ্যায় লিখেছেন—শেখ মাসুদ, কামাল খাজা, রবিন পারভেজ, জীবন চৌধুরী ও বৃতেন্দ্র মালাকার।

স্থানিক রাজনীতি দুই মেরুকরণের ফলে অন্য রাজনৈতিক সংগঠনগুলো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে সাইনবোর্ড সর্বস্ব হয়েছে। অন্যদিকে. শিল্প-সাহিত্যচর্চা ও চর্যার পরিসরে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে গেছে। আশির দশক পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো বিভিন্ন দিবস বা দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশের রীতিনীতি জারি রেখেছে।

তরুণদের সাহিত্যচর্চার আবাদী চাতাল হচ্ছে স্থানিক দিবসভিত্তিক স্মরণিকা ভাঁজপতা। সৃষ্টিশীল মানুষের আঁতুরঘর। নয়ের দশকের শেষে এই প্রবণতা ক্রমশ ভাঙতে ভাঙতে এখন দশা করুণ। মরুভূমি।

১৯৮০ সালের ২১ জুলাই ‘শহীদ কর্ণেল আবু তাহের স্মরণে’ প্রকাশিত হয় ‘বিস্ফোরণ’। জাসদ ছাত্রলীগ তাহের স্মরণে প্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জন্ম। ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও হটকারিতার ভেতর যখন দেশের রাজনীতি পাক খাচ্ছিল তখন ট্রাইবুনালের রায়ে ফাঁসি হয় কর্নেল তাহেরের।’ বিস্ফোরণের সম্পাদক ছিলেন কবির উদ্দিন আহমেদ।

খন্দকার মুজাহিদুল হক তাঁর ‘একজন তাহের : আমরা তার উত্তরাধিকার’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘তাহের যখন সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তখনই সেনাবাহিনীর বনেদী ভূমিকাকে নির্মমভাবে সমালোচনা করেছেন এবং বলেছিলেন সেনাবাহিনী হবে সাধারণ মানুষের বন্ধু, মুক্তি আর প্রগতির সহযাত্রী এবং উৎপাদন ও সমৃদ্ধির প্রতীক।’

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

ক.

‘মেরেছো যারে সেও তাহের—

আমিও তাহের

কর্ণেল তাহের’

(রবিন পারভেজ)

খ.

না, শুনব না সামাজিকতা কোনো—দোহাই তোমার;

আমি অগ্নিগীরির মিতা।

আমি গরিলার বন্ধু—সিংহের দোস্ত—হতে পারি

আমার আগমন

তোমার ধ্বংশের অভিপ্রায়।

(সঞ্জীব চন্দ বিল্টু)

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৪তম পর্ব

‘এদেশ সৃষ্টির জন্য আমি রক্ত দিয়েছি। আর সেই সূর্যের জন্য আমি প্রাণ দেবো—যা আমার জনগণকে আলোকিত করবে, উজ্জীবিত করবে। এর চাইতে বড় পুরস্কার আমার জন্য আর কী হতে পারে। আমাকে কেউ হত্যা করতে পারবে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে সমগ্র জাতিকে হত্যা করতে হবে। কোনো শক্তি তা পারে? কেউ পারবে না।’ জেল থেকে শেষ চিঠি : তাহের। ২১ জুলাই ১৯৭৬। ভোর চারটা। ঢাকা সেন্ট্রাল জেল। কর্নেল তাহেরের ‘শেষ চিঠি’ খুবই গুরুত্বের সাথে ছেপেছে।

বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ঝাণ্ডা উড়িয়ে জাসদের আবির্ভাব হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডামাডোলে জাসদের রাজনীতি বিকশিত না-হয়ে বরং অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্রমশ ব্র্যাকেট বন্দী হতে হতে শেষ পযর্ন্ত অন্য দলের লেজুড়বৃত্তিই তাদের আরাধ্য হয়ে পড়ল।

যদি বাহাত্তরে সবচেয়ে প্রাগ্রসর তরুণেরই বাংলাদেশ রূপান্তরের জন্য দার্শনিকভাবে যেমন লড়েছে, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও লড়েছে। স্থানিক রাজনীতিতে জাসদ-বাসদের কিংবা কমিউনিস্ট হোক সে চীনপন্থী বা রুশ অথবা অন্য কোনো বাম রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো সংগঠিত হলেও, তাঁদের চিন্তার বিস্তার ঘটাতে পারেনি।

যদিও মেধাবী তরুণের সমাবেশ দেখেছি আমি। জাসদ-বাসদের দার্শনিক রাজনৈতিক স্ট্যান্ড যদি চর্চিত হবার স্পেস পেতো, তবে সৃষ্টশীল গদ্য-পদ্যের বিকাশের ধারা বিস্তার ঘটত কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানিকে চিন্তাচর্চা করবার স্পেস গড়ে উঠেনি।

জাসদ প্রতিষ্ঠার পর পরই শেরপুরে জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা ক্রমেই স্কুল-কলেজগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। সাহিত্যপত্র প্রকাশের ভেতর দিয়ে তরুণদের মাঝে সাংস্কৃতিক চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে পারেনি। তেমনি খুব বেশিদিন তৎপরতাও চলেনি।

‘লাল আহ্বান’ ৭ নভেম্বর সিপাহী গণ-অভ্যুত্থান দিবসে এই স্মরণিকা প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। স্কুল-কলেজভিত্তিক কবিতা লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারিদের নিয়ে এই স্মরণিকা।

আরো ছিল সঞ্জীব চন্দের ‘৭ই নভেম্বর’; এম আলমগীরের ‘রাজনীতি প্রসঙ্গ’; মো. কাইউমের ‘কর্তব্য প্রসঙ্গে’ ও মুজাহিদুল হকের ‘অনিবার্য কথন।’

সম্পাদক জি এম আজফার তাঁর সম্পাদকীয়ে লিখেছেন, হাজার বছর ধরে নিরন্ন নিষ্পেষিত মানুষের সীমাহীন বেদনায়, বাংলার আকাশে যে ঘন কালো মেঘ জমাট বাধছিল, তারই ধমনীতে যে অকস্মাৎ বিদ্যুতের ধারা বয়ে গিয়ে, প্রচণ্ড বজ্রনাদে সমস্ত কালো আকাশ বরফের মতো গুড়ো গুড়ো হয়ে, বৃষ্টির আকারে নিরস মাটির দিকে ধেয়ে আসতেই শুরু হলো আরেক বাতাস—মানুষের আশার আকাশে দানবের পাখা ঝাপটানি।’

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...