shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৬তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৬তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৬তম পর্ব

চৌদ্দ

‘উচ্চারণ’ শেরপুর পাবলিক লাইব্রেরির সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে। সম্পাদক মুহম্মদ মুহসীন আলী। এটিই পাবলিক লাইব্রেরির প্রথম সাহিত্যপত্র। জেলা প্রশাসক ম. শফিউল আলমের প্রযত্নে সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন—এস জাহানারা ওয়াজেদ, মুহম্মদ আবু তাহের, সুনীল বরণ দে, গঙ্গেশ দে ও জাকির হোসেন।

মুহসীন আলী লিখেছেন, ‘সমকালীন চিন্তা চেতনার পরিপুষ্ট হৃদয়ের অনুভূতিকে আঁকড়ে ধরে বিন্যাস ব্যঞ্জনার অনুরণনে জীবনের বাঙ্ময়তায় প্রকাশ-প্রয়াস সাধ্য তো বটেই; ব্যস্ত জীবন যন্ত্রণার সুতীব্র দাহনে বিগদ্ধ হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেয়া কষ্টসাধ্যও। তবু ‘মনের খোরাক জোগাড় করিতে যাইয়া পেটের খোরাকে টান’ পড়লেও বিদগ্ধজনেরা যুগে যুগে ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ হৃদয়-চেতনার জারকে সোনার ফসল উপস্থাপনা করে থাকেন; আর সমাজ ও জাতির সামনে তোলে ধরেন সমকালের কথকতা।’

এই কথকতা ‘উচ্চারণে’ উচ্চারিত। শেরপুরে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রের মাঝে এটি অনন্য। লেখা নির্বাচনে সম্পাদক সচেতন ছিলেন। মুহসীন আলী গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকার সাথে জড়িত যেমন ছিলেন, তেমনি প্রগতিশীল আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের চর্চা ও চর্যার ক্ষেত্রে শেরপুরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘বাণী বিচিত্রা’ (১৯৫৭), গণবার্তা (১৯৭২)-সহ বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদনা কাজে জড়িত ছিলেন। যদিও পত্রিকাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। স্থানিক ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত ছোটকাগজের এই এক অনিবার্য নিয়তি। সম্পাদকদের উদারতা, কবি লেখকদের সক্ষমতা, পাঠকের আগ্রহ এবং অন্যদিকে স্থানীয় আর্থসামাজিক পরিকাঠামোও অনেকাংশ দায়ী।

মুহাম্মদ মুহসীন আলী মোজাম্মেল হক ও সুশীল মালাকারদের প্রজন্ম নানা প্রতিকূলতার ভেতরও ছোট কাগজ প্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকতা চর্চা করেই মূলত পরবর্তী সময়ে প্রজন্মের জন্য পথ নির্মাণ করে গেছেন।

শেরপুরে পাঠাগার চর্চার ইতিহাস শেরপুর অঞ্চলের সামাজিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি পরিগঠিত হবার সময় থেকেই সম্পৃক্ত।

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন নয়আনীর বাড়ীর ‘হেমাঙ্গ লাইব্রেরি’ সম্পর্কে উদ্বৃত্তৃ দিয়েছেন Gazetteer of the mymensingh district থেকে। ‘The 9 ana bari contains a library which boasts of some manuscripts 500 years old.’১৩

অন্যদিকে, পৌন তিনআনীর জমিদার সতেন্দ্র মোহন চৌধুরীর মাতা হিরন্ময়ী দেবীর নামে নিজ বাড়িতে ‘হিরন্ময়ী লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠা করেন।১৪ এই পাঠাগারের বিস্তার ঘটান তাঁর পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত জি কে স্কুলেও পরবর্তী সময়ে কৃষি বিদ্যালয়ের পাঠাগার স্থাপন করে।

এই তথ্যগুলো শেরপুরে জারি আছে। শেরপুর নিয়ে যারা কাজ করেছেন, প্রত্যকেই এই তথ্য হাজির করেছেন। ‘জয় কিশোর লাইব্রেরি’ নামেই একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার তথ্য পাই। কিন্তু কে বা কারা এই প্রান্তিকে উদ্যোগ গ্রহণ করল বা কোথায় পাঠাগারটি ছিল তা জানতে পারিনি। এখানে উল্লেখ্য যে, জমিদার সতেন্দ্র মোহন চৌধুরীর মাতা হিরন্ময়ী দেবী কবি ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘পুষ্পাধার’।

রাজবাড়ির অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা পাঠাগারে স্বাভাবিকভাবেই সর্বসাধারণের প্রবেশের সুযোগ ছিল না। পরিবারবর্গের পঠন-পাঠনের সুন্দর বিন্যাস বটে। জমিদারদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা দেখি নিশ্চয় এই পাঠাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে সর্বসাধারণের পঠন-পাঠনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রিডিং ক্লাব’।১৪ সময় ১৯২৬। কে বা কারা রিডিং ক্লাব প্রতিষ্টা করল তা বিজয় কৃষ্ণ নাগ লিখেননি। তিনি তাঁর ‘নাগবংশের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এখানে মাসিক চাঁদা দিয়া সর্ব্বসাধরনে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক কাগজাদি ও নানা প্রকার বই পাঠ করিতে পারে এবং ডিপোজিট দিলে পুস্তকাদি বাড়ী লইয়াও পাঠ করা যাইতে পারে।’১৪

সেই রিডিং ক্লাবের ধারাবাহিকতার ফসল আজকের জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার। ১৯৯১ সালে রাজস্বখাতে যুক্ত হয়ে পাঠাগারটি নামফলকে ‘খান বাহাদুর ফজলুর রহমান জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার’ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও, সরকারি কাগজপত্রে ‘জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার’ হিসেবে চিহ্নিত।১৫

সমগ্র শেরপুর জেলায় বর্তমানে ২৮টি নিবন্ধিত পাঠাগার রয়েছে, জানালেন গ্রন্থাগারিক সাজ্জাদুল করিম। পাঠাগারের তৎপরতা আরো সম্প্রসারণমূলক সেবায় তিনি যুক্ত করেছেন নানামুখী কার্যক্রম। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে প্রতি মাসের প্রান্তিকে আয়োজিত হচ্ছে ‘সাহিত্য আড্ডা ও চা চক্র’। এই আড্ডায় শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকেরা অংশগ্রহণ করছেন।

সাজ্জাদুল করিম জানালেন, ‘পাঠকের সাথে যুগসূত্রের পরিসর সৃষ্টি করে একটি সাহিত্যপত্রিকা। পাবলিক পাঠাগারে নিয়মিত একটি সাহিত্যপত্র থাকার প্রয়োজনীতা রয়েছে।’

‘উচ্চারণ’ প্রকাশের বহুদিন পর জেলা প্রশাসক মো. নাসিরুজ্জামানের প্রযত্নে এই পাঠাগারে গঠিত হয় ‘শেরপুর সাহিত্য কেন্দ্র’। হাকিম বাবুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ধ্বনি’ (২০১০)।

হাকিম লিখেন, ‘ধ্বনির স্বভাবই যেমন ধ্বনিত হওয়া, জানান দেয়া চারপাশকে; আমরাও নতুন প্রজন্মকে জানান দিতে চাই—জানিয়ে দিতে চাই এই বলে যে, নিজেকে শুদ্ধ, পরিশীলত এবং পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়তে বইয়ের বিকল্প নেই। পণ্য সভ্যতার এই আবিলময় যুগে আকাশ সংস্কৃতির করালগ্রাসে আমরা আজ দিশেহারা। এর থেকে বেরিয়ে আসার বড় একটি রাস্তা হচ্ছে পাঠ এবং পাঠ্যাভাস।’

খান বাহাদুর ফজলুর রহমান সরকারি গণগ্রন্থগারকে কেন্দ্র করে সাহিত্য কেন্দ্রের পথ চলা শুরু হলে তার ধারাবাহিকতা থাকেনি। বন্ধ হয়ে গেছে ‘ধ্বনি’। বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচি এখন জেলা শহরে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ‘দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।১৫

এখানে একটি তথ্য যুক্ত করা যেতে পারে, ‘১৯৭৯ সালে পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক লুৎফর রহমান মোহনের প্রচেষ্টায় শেরপুরে একটি স্মরণীয় সাহিত্য সন্মেলন হয়।’১৬

আবু তাহের তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন, ‘সেই অনুষ্ঠানে—যতীন সরকার, ড. সনজিদা খাতুন, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, কাজী রোজী ও ইমদাদুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন।’ সভাপতিত্ব করেন মুহাম্মদ আবু তাহের।

তিনি লিখেছেন, ‘কোনো গান-বাজনা নয়, শুধু কবিতা শোনার জন্য উপচে-পড়া শ্রোতার ভীড় দেখে অতিথিরা তাঁদের ভাষণে বিস্ময় প্রকাশ করেন।’১৬

সেই যাই হোক। পাবলিক লাইব্রেরির ‘উচ্চারণ’ প্রসঙ্গে কথায় কথা বাড়ল। উচ্চারণের সূচিপত্র তুলে দিচ্ছি :

প্রবন্ধ

ড. আলী আসগর : ভাষার শরীক যে জন

গোলাম সামদানী কোরায়শী : ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফেরে

সচ্চিদানন্দ চক্রবর্তী : রবীন্দ্র বিদ্রোহের স্বরূপ

যতীন সরকার : শহীদ বুদ্ধিজীবীর উত্তরাধীকার

কবিতা

সুকুমার বড়ুয়া, আল মুজাহিদী, সাযযাদ কাদির, উদয় শংকর রতন, সুনীল বরণ দে, গঙ্গেশ দে মুশতাক হাবীব, আপেল মাহমুদ

গল্প

আরেফিন বাদল, খালেদা রায়হান, মোস্তফা কামাল, মুহাম্মদ মুহসীন আলী

গীতিনাট্য

প্রদীপ কান্তি মজুমদার : বর্নমালার গাথা

উপন্যাস : অনুবাদ Albert camus-এর outsider

মুহাম্মদ আবু তাহের : ভিনদেশী

নবীনদের পাতা

সৌমিত্র শেখর দে : রবীন্দ্রনাথ : নজরুলের প্রেরণার উৎস

মলয় মোহন বল : কিশোর বিজ্ঞান আন্দোলন ও প্রাসঙ্গিক কথা

এ ছাড়া লিখেছেন—শিব শংকর কারুয়া, মালবিকা লাবনী, পরিমল চক্রবর্তী, রিয়াজুল হাসান সম্রাট প্রমুখ

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...