shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৯তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৯তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৯তম পর্ব

সতেরো

এই সময়ে আরেকটি কাগজের নাম ‘রক্তের আলপনা’ (১৯৮১)। মুক্ত বাংলার প্রথম দশক, তখনো রক্তের দাগ লেগে আছে এখানে-সেখানে। ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে যে আলপনা এঁকেছি আমরা তাঁর নামই বাংলাদেশ। রক্তে আঁকা আমাদের বাংলাদেশ ‘রক্তের আলপনা’। সম্পাদক এখলাছ উদ্দিন আহাম্মদ (মৃত্যু ১৯৯৬)। দুরন্ত চৌধুরী নামেই পরিচিত। দুয়েকটি সংখ্যা বের করার পর বন্ধ হয়ে যায় ‘রক্তের আলপনা’।

যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট নামাঙ্কনে কাগজ করেননি। দিবসভিত্তিক সংখ্যায় বিভিন্ন নামে প্রকাশ। ঈদ-উল-আজহা ও ঈদ-উল-ফিতরে উপলক্ষ্যে প্রকাশিত সাহিত্য সংকলনের নাম ‘আলিঙ্গন’। কখনো একফর্মা বা কখনো হাফ ফর্মার লেটার প্রেসে নিউজপ্রিন্টে ছাপা। ‘আলিঙ্গন’ সর্বশেষ প্রকাকাশিত হয় ১৪০০ সালে ইউনুস প্রেস থেকে।

এ সংখ্যায় ছিল মো. আনছার আলী’র ‘স্রষ্ঠার মহাশক্তি’সহ কয়েকটি গদ্য ও কবিতা। কবি রফিকুল ইসলাম আধার তাঁর কবিতায় লিখেছেন—

.

‘এখানে বিশুদ্ধ বসতির স্বপ্ন দেখো না

বিশুদ্ধ বসতিতে বসবাসের স্বপ্ন

বাসি গোলাপের পাপড়ির মতো

অচিরেই ঝরে যায়

বাতাসের নিঃশব্দ ঢেউয়ে।’

(স্বপ্নের জমিনে সবুজ বসতি)

.

রফিকুল ইসলাম আধার গত শতকের আটের কবি। প্রচণ্ড কবিতাপ্রেমী আধার আট ও নয়ের দশক ধরে দুই হাতে তুমুল কবিতা লিখেছেন, এখন আইনপেশায় নিযুক্ত থেকেও যুক্ত সাংবাদিকতায়। আধারের কবিতা ঝরঝরে।

দুরন্ত চৌধুরী মূলত নাটকের সুজন। যৌবনে চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত থেকেছেন। স্বাধীনতার পরে শেরপুরে ‘রাজহংস প্রডাকশন হাউজ’ সেই আদলে গড়ে তুলেন। ‘ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক ‘রক্ত পলাশ’ তাঁরই রচনায় ও নির্দেশনায় মঞ্চায়ন হয়।

সম্পাদক আবু বকর জানালেন, ‘সত্তর-আশির দশকে একাধিক নাটক তাঁর নেতৃত্বে মঞ্চায়িত হয় শেরপুরের টাউন হলে। নাটকে নৃত্য ও গানের সমাবেশ ঘটান তিনি।’ দুরন্ত চৌধুরীর ‘মৃত্যুর ঘণ্টা’ নাটকটি ১৯৭৮ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে রাজহংস প্রোডাকশন হাউজের প্রযত্নে টাউন হলে মঞ্চায়িত হয়। ‘রক্তের আলপনা’য় নাটকটি মুদ্রিত হয়।

সম্পাদক দুরন্ত চৌধুরি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর ঘণ্টা একটি বাস্তব ও রূপকের মিশ্রণে আঁকা একটি বিপ্লবী নাটিকা।’ দুরন্ত চৌধুরী ছাড়াও এই ছোট্ট নাটিকায় অভিনয় করেন আব্দুর রাজ্জাক, আশীষ মতিয়ুর রহমান ও মুন্নী।

দুরন্ত চৌধুরী রূপবান (১৯৬৫) ও জরিনা সুন্দরী চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ও করেন—জানালেন তাঁর ছেলে ব্রতচারী নূর মোহাম্মদ তারাকী। এখনে একটু নোক্তা দিয়ে রাখি বাংলাদেশ ব্রতচারী সমিতির শেরপুর জেলা শাখা গঠিত হয় ২০০৬ সালে। যদিও কিছুদিন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও, এখন নজরুল শিক্ষাঙ্গন ছাড়া আর কোথায় ব্রতচারী তৎপরতা চোখে পড়ে না।

ব্রতচারী আন্দোলন একটি আর্দশভিত্তিক কর্মতৎপরতা। গত শতকের তিনের দশকে সিলেটের ভূমিপুত্র গুরুসদয় দত্ত (১৮৮২-১৯৪১) এই আন্দোলনের ডাক দেন। মানুষের জীবন সার্থক ও পূর্ণ করে আদর্শ মানুষ গড়ার অভিপ্রায়ে গুরুসদয় দত্ত পাঁচটি ব্রতের কথা ঘোষণা করেন—জ্ঞানব্রত, শ্রমব্রত, সত্যব্রত, ঐক্যব্রত ও আনন্দব্রত।

‘কোনো অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য মনে দৃঢ় পবিত্র সংকল্প গ্রহণ করে একাগ্রচিত্তে সেই সংকল্পকে কার্যে পরিণত করে তুলবার কায়মনেবাক্যে চেষ্টার নামই ব্রত।’২৮

ব্রতচারী নরেশ বন্দ্যোপাধ্যায় আরো লিখেছেন, ‘আদর্শ মানুষ বলতে তাদেরই বোঝায়, যারা দেহে মনে চরিত্রে বাক্যে আচরণে কৃত্যে নৃত্যে সংঘে নিজের দেশের আদর্শ মেনে নিজেকে তৈরি করবার,… আদর্শ মানুষ গড়ার পরিচেষ্টা, দেশসেবক সৈনিক গড়ার পরিচেষ্টার নামই ব্রতচারী আন্দোলন।২৮

এমন হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে ২০০৮ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত হয় ৪র্থ জাতীয় ব্রতচারী অনুশীলন শিবির। তার আগেই শেরপুর জেলা শাখা গঠিত হয় ডালিয়া সামাদের নেতৃত্বে। বিকশিত হবার আগেই ঝরে পড়ে।

.

ব্রত লয়ে সাধব মোরা শেরপুর** সেবার কাজে

শেরপুর** সেবার সাথে বাংলা সবার কাজ—

বাংলা সেবার সঙ্গে বিশ্ব-মানব সেবার কাজ।

তরুণতার সজীব ধারা আনব জীবন মাঝ

চাই আমাদের শক্ত দেহ মুক্ত উদার মন

রীতিমত অনুসরণ করব প্রতিপণ২৮

** শেরপুর = যে যেখানের ব্রতচারী সেখানকার নাম।

.

এমন একটি আন্দোলন আজকের বাংলাদেশে জরুরি। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়—মাটি মানুষকে আশ্রয় করেই আমাদের আর্ন্তজাতিকতার চর্চা। শেকড়বিহীন বিশ্বায়িত হয়ে মানুষের মুক্তি নাই। গুরুসদয় দত্ত গোড়ার কাজটি করে গেছেন। এখন দরকার হৃত গৌরব পুরুদ্ধার।

ব্রতচারী আন্দোলনের একটি জারিগান আছে মেয়েরা রুমাল উঁচিয়ে নৃত্যে গীত—

.

ও কাইয়ে ধান খাইল রে

খেদানের মানুষ নাই।২৮

.

সে যাক, কথা হচ্ছিল এখলাস উদ্দিন আহাম্মদকে নিয়ে। আটের দশকের কবি রবিন পারভেজ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আশির শেষের দিকে নজরে আসে নীরবে পথ চলা কম কথা বলা একজন নিমগ্ন নিঃসঙ্গ সাহিত্যকর্মীর, যিনি আপন মমতায় সাহিত্যের কাগজ করেন একা, ঘরে ঘরে কাগজ ফেরী করে বেড়ান একা একা, নিঃশব্দে। শহরের এপথে-ওপথে মাঝেমধ্যেই দেখা হতো তাঁর সাথে, কিন্তু কথা হতো না। হয়ত বয়সের বিস্তর ব্যবধানই এমনটা দূরত্বের হেতু।’

সম্ভবত ’৮১-তে একদিন খরমপুরের রশিদ প্রিন্টিং প্রেসে গেলে তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে আসি। কথা হয়। উনার নাম এখলাছ উদ্দিন আহাম্মদ (দুরন্ত চৌধুরী)। গল্প কবিতা নাটক লেখেন। কাগজ করছেন ‘রক্তের আলপনা’ নামে। সম্পাদনা নিয়ে টুকিটাকি ভাবনার আদান-প্রদান হয়। ব্যাস, ওইটুকুই। তার পর, সেই দূরত্বটা রয়েই যায়।

ক্যামেলিয়া সান্যালের সাথে ‘মানুষ থেকে মানুষে’ সম্পাদনায় হাত দিলে প্রেসের সাথে সম্পর্কটা আরো মজবুত হয়। দুরন্ত চাচার সাথেও সেখানেই ঘন ঘন দেখা হতে থাকে। উনি আড্ডাবাজ ছিলেন না। কেবল কথার উত্তর দিয়ে আপন পথ ধরতেন। কথা বলতেন ধীরে ধীরে মৃদু স্বরে। কাগজ প্রসঙ্গে বরাবর হতাশাই ব্যক্ত করতেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেন—‘চাচারা, কি করি, এসব না-করে থাকতে পারি না তাই করি। এসবের মর্ম বোঝার লোক কই। নাই।’

বলতেন বটে, কিন্তু ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারি, মার্চ বা ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন সংকলন প্রকাশে। ধীর পায়ে শহরময় ঘুরে ঘুরে বিলি করে বেড়াতেন। আমরা মজা করে বলতাম—‘চাচা নামে দুরন্ত চালে মন্থর।’ তবে কথায় ছিলেন রসিক। সেই সময়টাতে আমাদের ‘মানুষ থেকে মানুষে’ আর দুরন্ত চাচার কাগজটিই ছিল নিয়মিত। এ ছাড়া আরো সাহিত্য কাগজ বেরুতো, বিভিন্ন নামে—অনিয়মিত।

এভাবেই চলছিল। দুরন্ত চাচা যেন আমাদের একজন সঙ্গীর মতোই পাশাপাশি চলছিলেন। হঠাৎ একদিন দেখি চাচার কালো বেশ ধারণ। কালো ফতোয়া কালো থান। কানে এলে উনি নাকি স্বপ্নে কিছু একটা প্রাপ্ত হয়েছেন (এ ব্যাপারে আমরা তাঁকে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করিনি)।

এর পর থেকেই উনার শরীর ক্রমশই ভেঙ্গে পড়তে থাকে। দ্রুত দুর্বল হতে থাকেন, আর একদিন আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন।’২৭

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব । ১৯তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...