shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২২তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২২তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২২তম পর্ব

একুশ

কবি সুহৃদ জাহাঙ্গীর গত শতাব্দীর আটের দশকের কবি। অধ্যাপনা থেকে অবসর নিয়েছেন। বত্রিশ বছর কলেজে পড়িয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বাংলায়। অনেকের সাথে গড়ে তুলেছেন কলেজ, শেরপুরের প্রান্তিক সীমান্তবর্তী থানা ঝিনাইগাতিতে। এখান থেকেই অবসর নিলেন।

আদিবাসী বেষ্টিত থানা ঝিনাইগাতি। লক্ষ্য ছিল—সুহৃদের কবিতার ভাষায় বলি :

.

‘একটি আলোর কণা থেকে লক্ষ প্রদীপ জ্বলে

একটি মানুষ মানুষ হলে বিশ্ব ভুবন টলে।’

.

তারও আগে কবিতার হাতছানি। কবিযাপন। বক্মীগঞ্জের সাধুরপাড়ায় কবির বেড়ে ওঠা। একাত্তরে হাতে তুলে নেন হাতিয়ার। বাড়ি থেকে পালিয়ে সপ্তম শ্রেণির সুহৃদ এগারো নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। যারা কিশোর বয়সে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি তাদের একজন। ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের সর্বত্র। নব্বইয়ের মাঝামাঝি প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। যেদিন অবসরে গেলেন, সেদিন হাঁটছিলাম শহরজুড়ে—কবির সাথে, তিনি হাঁটতে হাঁটতে বললেন—

.

‘এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।

আরেক লগ্ন শুরু।

তবু শুভ কর্মপথে ধরো নির্ভয় গান।’

.

এক অখণ্ড অবসর যাপন নিয়ে সুহৃদের এখন পথ চলা। শামছুন নাহার ঊষা সুহৃদের যাপনের সহযাত্রী। তিনিও কলেজে পড়ান, এক ছেলে ঋভু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়নে স্নাতক। কবি সুহৃদ যেমন শব্দসন্ধানী, তেমনি ঋভুর হাতে রং তুলি ও কণ্ঠে সুর নিয়ে পথ চলছেন।

সুহৃদের বাড়ির নামটিও চমৎকার। ‘তপোবন’ নানা ফুলের সারি সারি গাছ। চৌচালা টিনের পাকাবাড়ি। পেছেন শান বাঁধানো ছোট্ট শহীদ মিনার। খুব কম বাড়িতেই আমি শহীদ মিনার দেখেছি। দেশ মাটি মানুষের প্রতীক শহীদ মিনার। আমাদের উৎসমূল। নাম ফলকে উৎকীর্ণ ‘সত্যম সুন্দরম’।

কবি সুহৃদ সত্যের সাধক : সুন্দরের সাধক। কবি যিনি তাকে সত্যের পথে, সুন্দরের পথে যাত্রী হতে হয়। সুহৃদের যাপনও তেমনি—রাবীন্দ্রিক ঘরনার; শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখশ্রী, সাদার ভেতর গাছিখানেক কাঁচাচুল। মাথায় ছোট্ট খোপা গার্ডার দিয়ে বেঁধে রেখেছেন। চেহারায় সাত্ত্বিক ভাব; কথোপকথনে প্রমিত উচ্চারণ—আঞ্চলিকতার লেশ মাত্র নেই।

‘আড্ডার জন্য আড্ডা নয়, জীবনের জন্যেই আড্ডা’ সেই জীবন চর্চিত আড্ডার কাগজ ‘আড্ডা’র যাত্রা শুরু গত শতাব্দীর নয়ের দশকের শুরুতে। সম্পাদক সুহৃদ জাহাঙ্গীর। কয়েকটি সংখ্যা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বরাতে সম্পাদিত। পেশাগত পরিচয় ও পৈতৃক নামে কাগজ প্রকাশ শুরু করলেও, পরবর্তী সময়ে সুহৃদ জাহাঙ্গীর নামাঙ্কেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন—পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে।

‘আড্ডা’ ত্রৈমাসিক কবিতা পত্র প্রকাশিত হয় প্রকাশক রবিন পারভেজের প্রযত্নে মওলা প্রিন্টিং প্রেস থেকে। যদিও সুহৃদ জাহাঙ্গীর ১৯৯২ সালে আরেকটি কাগজ সম্পাদনা করতেন। তৎকালীন ঝিনাইগাতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অসিত কুমার মুকুটের পৃষ্ঠপোষকতায় কাগজটি প্রকাশিত হয়।

‘অনুশীলন’—অনুশীলন সাহিত্য পর্যদের মুখপাত্র। নিয়মিত সাহিত্য সভা ও দেয়ালিকা প্রকাশে তৎপর থাকলেও, কাগজটি আর দ্বিতীয় সংখ্যা বের হয়নি। স্থানিক তরুণ কবিদের কবিতার পাশে প্রকাশিত হয় সম্পাদক সুহৃদের চমৎকার একটি প্রবন্ধ, ‘চিরায়িত বাংলা : অবহেলিত লোক ঐতিহ্য।’

জীবোন চৌধুরী স্থানিক কাগজে আশির দশক থেকেই তৎপর। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে সময়ের কথকতা। ‘আড্ডা’য় জীবোন চৌধুরী নিজেকে মেলে দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আর কবিতার জগতে থাকলেন না। সরে পড়লেন। গার্হস্থজীবনে ডুবে গেলেন।

.

ক.

তুমি কে হে? ভুল আলো জ্বেলে—

অসীম ধৃষ্টতায়! নিয়ে যেতে চাও—

কবরের স্তব্ধতায়! বারুদ মেশাতে

চাও—হাস্না হেনার সুবাসে?

(ভুল আলো জ্বেলে : জীবোন চৌধুরী)

খ.

বড় বেশি উৎপাত, বড় বেশি—

এইসব ইদুঁরেরা

সকল বর্ণের—নীল, সাদা, কালো—

অন্ধকার আমদানীতে খুবই ওস্তাদ।

(ইদুঁর + ইদুঁর = ইদুঁর : জীবন চৌধুরী)

গ.

ভাসমান পতিতার মতো

গন্তব্যহীন

লক্ষহীন

এই নষ্টসময়

ফেলে রেখে যায়

জটিল যন্ত্রণা

অবিরাম

অবিরত

(জীবন চৌধুরী)

.

তেমনিই আরেক কবি রোমান জাহান। কবি ও কবিতা নির্বাচনে সম্পাদক সুহৃদ যত্নবান। ধারাবাহিক না-হলেও, কবি রোমান একনো কবিতার ভুবনে আছেন। ‘কেবলই ক্ষয়ে যাওয়ার কাহিনি’ (২০১৯) কবি রোমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

পেশায় তিনি উকিল। ঢাকা জজ কোর্টে প্র্যাকটিস করছেন। তিনি কবিতায় সহজ ভঙ্গি আর দৃঢ় উচ্চারণ নিয়ে নয়ের দশকে হাজির ছিলেন। আড্ডাসহ অন্যান্য কাগজে। স্থানিকতার প্রক্ষাপটে তাঁর কবিতা পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে।

.

ক.

আমি কি করবো? কাকে দোষ দেবো?

কার সাথে জড়াবো বিতর্কে? কিংবা চাইবো কৈফিয়ত?

নিয়তি নাকি ঈশ্বর!

কেননা

নিয়তি ও ঈশ্বর

দুটোই একা এবং একত্রে—

ইদানীং আমার কাছে আজব বিষ্ময়!

(একা এবং একত্রে : রোমান জাহান)

খ.

আমাদের চোখের রেটিনায় যখন তরল দুঃখের আগুন

হৃদয়ে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ

হৃদপিণ্ডে জলন্ত ফসফরাসের উচ্ছাস

মাথার ভেতর উত্তপ্ত চৈত্রের দুপুর

আমরা যখন ঘুমহীন চোখে উদগ্রীব

সুমনার জন্য

(সুমনা ভালো আছো : রোমান জাহান)

গ.

ইচ্ছে হয়

সমস্ত নিঃশ্বাসজুড়ে

স্নায়ুর খুব অভ্যন্তরে

ঢেলে দেই আত্মকথনময়

ভুল অপেক্ষায়

বিশ্বাসী সময়;

এটা ভালোবাসা হবে নিশ্চয়?

(বিশ্বাসী সময় : রোমান জাহান)

.

সুহৃদের আড্ডায় আরো লিখেছেন—মহাদেব সাহা, আবিদ আজাদ, আহমেদ আজিজ, হাদিউল ইসলাম, মুজিব মেহেদী প্রমুখ।

পূর্ব ইউরোপে তখন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র একের-পর-এক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। একভূত রাষ্ট্রগুলো টুকরাটাকরা হচ্ছে। মার্ক্সবাদে আস্তাহীনতা। স্নায়ু যুদ্ধ শেষ। ভাঙছে দেশ আদর্শ পার্টি।

বাংলাদেশেও তাঁর ঢেউ লেগেছিল তখন। ভেঙে গেছে একান্নবর্তী সংসারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির অফিস। মাঝখানে উঠেছে বিভক্তির দেয়াল। বিপ্লব শ্রেণি সংগ্রাম পার্টির লাইন সব—সবকিছু মাটিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ দলছুট হচ্ছেন। দৌড়ে কেউ ডানে কেউ বামে কেউ মধ্যপন্থি। দিশেহারা নেতা-নেতৃত্ব-কর্মী। সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন সৌমিত্র শেখর।

.

নেশায় যদি ভালোবেসেছিলে

পেশায় যদি ভালোবেসেছিল

বিপ্লব!

তুমি তো হবেই আজ সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতন।

(আহ্ কমরেড : সৌমিত্র শেখর)

.

কবি সুহৃদের ‘আড্ডা’ ঠিক ধারাবাহিক ছিল না। নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে প্রায় চৌদ্দটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালের পর আর কোনো সংখ্যা বের হয়নি। একই প্রচ্ছদ একাধিক সংখ্যায় ব্যবহার করার ফলে কাগজের বৈচিত্র কিছুটা ক্ষুণ্ন হলেও হতে পারে, কিন্তু নিউজ প্রিন্টে প্রকাশিত ‘আড্ডা’য় তাঁর সময়ের ভালো লেখাগুলোর সমাবেশ করেছেন। শুধু স্থানিক কবি নয়; অন্য জেলার কবিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

পরিমল চক্রবর্তী নিয়মিত না-হলেও স্থানিক প্রায় সকল কাগজে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে তাঁর যাত্রা শুরু।

.

যাবতীয় জিজ্ঞাসার আড়ালে

অপরিহার্য হয়ে উঠে

একগুচ্ছ প্রতিবাদ

মাতাল রাতে নষ্ট ভ্রুনের মতো পরিত্যক্ত

মনে হয় সবকিছু

নগ্ন নীল করিডোরে।

(নীল করিডোরে : পরিমল চক্রবর্তী)

.

হাদিউল ইসলাম নব্বইয়ের কবি। দুটি কাব্যগ্রন্থের জনক। পেশায় অধ্যাপনা করছেন। ‘সাঁকো’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা শ্রীবর্দী থেকে করেছেন। সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

.

যেমন ইচ্ছে পরীক্ষা নাও নিতে পারো

পাশ করলেই আরক্ত ঠোঁটে মার্ক চাইবো চুম্বন।

প্রমোশন চাবো অই মায়াবী বুকের যুগল চন্দ্রাসনে

যেখানে মুখ গোঁজে সহসা নেয়া যাবে

অমৃতের খোঁজ।

বলো কী পরীক্ষা নেবে তুমি?

(এ্যাগজামিন : হাদিউল ইসলাম)

.

কবি সম্পাদক সুহৃদ তাঁর ‘আড্ডা’য় কোনো গদ্য ছাপেননি। সম্পাদকীয় নেই। জাতীয় দিবস ছাড়াও করেছেন—রবীন্দ্র মৃত্যুবার্ষিকী সংখ্যা (১৩৯৯), রবীন্দ্র জয়ন্তী সংখ্যা (১৩৯৯), ঈদুল আযহা সংখ্যা (১৩৯৬)। কিন্তু কোনোটাতেই কোনো সম্পাদকীয় লেখেননি এই বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক।

স্থানিকতার প্রেক্ষিতে পাঠক নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিংবা যাপনে ঈদের গুরুত্ব মাহাত্ম্য নিয়ে সম্পাদকের ভাষ্যের অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর ‘আড্ডা’ টাউন শেরপুর ছাড়াও থানা শহরে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেবার তার কসরত ছিল। এটি ছোটকাগজের দায়ও বটে—সেটি তিনি করেছেন, এ-কথা স্বীকার্য।

আরেক সম্পাদক মামুনুর রহমান—নওহাটা মুক্তার বাড়ি থেকে সম্পাদনা করতেন ‘ময়ূখ’। নয়ের দশকের এক উদ্যমী সম্পাদক তিনি। একাধিক কাগজ সম্পাদনায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন বটে, তবে ‘ময়ূখ’-এ নিজেকে মেলে ধরেছেন শ্রমে ঘামে প্রেমে।

ময়ূখের কোনো বিনিময় মূল্য ছিল না। ‘বিনিময় : আপনার শুভেচ্ছা’। টাউন শেরপুরে একমাত্র ময়ূখই জাতীয় কবি স্মরণে সাময়িকী প্রকাশ করে। সাল ১৯৯৬ থেকে। পর পর তিন বছর করার পর বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ সংখ্যায় কবিতার পাশাপাশি ছিল ড. সৌমিত্র শেখরের ‘নজরুল আমার অহঙ্কার’ আর মুনীবর রহমানের ‘নজরুল : একটি প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ নিবন্ধ।

‘বীর ভোগ্যা বসুন্ধারার মন্ত্রে আজ যদি জেগে ওঠে প্রাণ; পৃবীর কোলাহলে দেয়া যায় যদি কোনো এক বিনাশী আগুন’ সম্পাদক মামুন লিখেছেন, ‘তা হলেই তো হতে পারি আমরা অমৃতের সন্তান।’ সেই অমৃতস্যপুত্রার সাধনার জন্যই সাহিত্য চর্চা ও চর্যা।

কিন্তু কাগজটি বিকশিত হবার আগেই ঝরে গেল—যা স্থানিক কাগজের অনিবার্য নিয়তি; ধারাবাহিক কর্ষণের জোর তার পেশিতে নাই তা কী করে বলি? যেটুকু করেছেন মন ঢেলে করেছেন। দীর্ঘদিনের কর্ষণের অভিজ্ঞতা স্থানিক কাগজের সম্পাদকদের হয়ে ওঠে না।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব । ১৯তম পর্ব । ২০তম পর্ব । ২১তম পর্ব । ২২তম পর্ব

Spread the love