shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৭তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৭তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৭তম পর্ব

সাতাশ

উনিশ’শ আটানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সংখ্যা দিয়ে রবিন পারভেজের ‘রা’ ছোটকাগজের যাত্রা শুরু। ঘোষলা ছিল ‘একটি ত্রৈমাসিক কবিতাপত্র’, কিন্তু যাত্রার ধারাবাহিকতা না-থাকলেও ‘রা’-এর মোট প্রকাশ সংখ্যা সাত।

এই প্রসঙ্গে রবিন লিখেছেন, ‘কেন এই দীর্ঘ বিরতি তার ব্যাখ্যা বাহুল্য মাত্র। তাই সে কৈফিয়তে যেতে চাচ্ছি না। অনিয়মতা ছোটকাগজের নিয়তি, এ রূপ নাকি তার ললাট লিখন।’ প্রতিশ্রুতি ছিল নিয়মতার। তবু সম্ভব হয়নি।

ভাঁজপত্র দিয়েই রবিন পারভেজের একক সম্পাদনায় এই কবিতাপত্র। পূর্বাপর রবিন পারভেজ যৌথতায় টাউন শেরপুরে নানা কাগজ সম্পাদনা করেছেন। দীর্ঘ সময় তাঁর কাগজ সম্পাদনা। গত শতকের এই কবি মূলত আটের দশকে বেড়ে ওঠা। শেরপুরের ছোটকাগজ আন্দোলনে তিনি একজন প্রাগ্রসর সম্পাদক। তাঁর কাগজ সম্পাদনা, কাব্যকৃতি ও কবিতা আন্দোলনে তাঁর কায়কারবার আলোচনার দাবি রাখে।

স্থানিক কবি, লেখক, সম্পাদক, অভিনেতা বা কোনো সাংস্কৃতিক কর্মীর নানা কর্মতৎপরতা নিয়ে খুব একটা কথাবার্তা সুশীল সমাজের জননায়করা কথা বলা দূরে থাক, কোনো লিখিয়েই কোনো পর্যালোচনামূলক আলাপচারিতা নেই; আছে খিস্তিখেউড়। অপরের সৃষ্টি নিয়ে পড়াশোনা দূরের কথা নিদেন পক্ষে তথ্য হিসেবে হাজির নেই তাদের কাছে।

তবে রবিন পারভেজ অগ্রজ কবি রণজিত নিয়োগীকে নিয়ে ‘রা’ সংখ্যা করে কিছুটা দায়মুক্তি ঘটিয়েছেন—এ জন্য নিশ্চয় তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ পাবার দাবি রাখে।

রণজিত নিয়োগী টাউন শেরপুরে যেমনম তেমন সমকালীন বাংলা কবিতায় একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কাব্যকৃতি প্রচুর। প্রকাশ খুবই কম। নানা কারণেই তাঁর জীবদ্দশায় বই প্রকাশ হয়নি। তাঁর কবিতার প্রচার ছোট গণ্ডীর ভেতরই রয়ে গেল। তাঁকে নিয়ে রবিনের বিশেষ সংখ্যা সেদিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য।

রবিনের যাত্রাপথ দীর্ঘ। তাঁর অগ্রজ ও তাঁর সমসাময়িক কবিদের নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। চায়ের আড্ডায় টুকরোটাকরা মন্তব্যই তিনি তাঁর দায় মিটিয়েছেন।

স্থানিকে কবিতা পত্রিকা করবার যে হুজুগ বা হিরিক থাকে, সেটি তার প্রাথমিক আবেগীয় নিন্মভূমি। দরকারও বটে। আবেগই তাকে আবাদী জমির দিকে নিয়ে যায়। নইলে বালখিল্যতায় জীবন কাটে।

কবি তকমা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এলোমেলে চুল দাঁড়ি নিয়ে নাগরিকের মাঝে উপস্থিত থেকে এক ধরনের সুখ আসে বটে—প্রকৃত পক্ষে সাহিত্যের কোনো কাজে আসে না। সমাজ রূপান্তরে সাহিত্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। লিখিয়ে দম্ভ নিয়ে গজদন্তমিনারে বসত করে বটে—ক্রমে সেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী যদিও চারদিকে মানুষ আর মানুষ। এ এক সাধারণ চিত্র—হোক সে টাউন শেরপুর কিংবা ময়মনসিংহ বা রাজধানী।

সমালোচনা বা পর্যালোচনা যাই বলি না কেন, এতো সাহিত্যের জমিনকে উর্বর করে তুলে। কবি পায় শক্ত মাটি। সম্পাদক হয় সময়ের দিশারী। নইলে আবেগে পদ্যচর্চা।

সম্পাদক রবিন দীর্ঘসময় ধরে সম্পাদনা করে আসছেন (১৯৭৯-২০২০)। হোক সে নিজের কাগজ বা যৌথমালিকানার কাগজ। তিনি সেই ভূমিকা নেননি।

শুধু কি তিনি? আমি মূলত রবিন পারভেজকে উপলক্ষ্য করে টাউন শেরপুরে যে বা যারা সাহিত্যচর্চায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন—দাবিদার তাদের সকলকে লক্ষ্য করেই এই প্রসঙ্গ তুলে ধরা।

তাই বলে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, আমার এই অনুযোগ রবিন পারভেজের দীর্ঘদিন সম্পাদক হিসেবে যে ভূমিকা তিনি পালন করেছেন—সেটি খাটো করে দেখছি; বরং খেদ এইখানে যে একাধিক কাগজ তাঁর প্রযত্নে হাজির থাকা সত্ত্বেও, তিনি সেগুলোকে যথাযথ ব্যবহার করতে পারেননি। তাঁর মতো টাউন শেরপুরে আর কেউ এতো দীর্ঘসময় ধরে কাগজ সম্পাদনার ক্রিচে থাকেননি।

যাই হোক। কথা হচ্ছিল ‘রা’ প্রসঙ্গে। ‘রা’ পরিচ্ছন্ন গোছালো কাগজ। টাউন শেরপুর যে সকল সাহিত্য পত্রিকা ছোটকাগজের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে তাদের তালিকা হাতে গোনা। ‘রা’ তাদের একটি।

‘রা’-এর প্রতিটি সংখ্যায় প্রচ্ছদ এঁকেছেন কবি শিল্পী রণজিত নিয়োগী। নিয়োগী’র আঁকা প্রচ্ছদে মানুষের মুখ—নানা আদলে আঁকা মুখ অনিবার্য, হোক সে পত্রিকা বা বইয়ের প্রচ্ছদ।

.

‘মূর্ত হয়ে ওঠে যার মধ্য দিয়ে তা-ই মূর্তি

তা-ই প্রতীক বটে ব্যক্তি ও ঘটনার

বীরত্ব ও আদর্শের’

(প্রতীকের শক্তি : রণজিত নিয়োগী)

‘জীবনের চেয়ে বেশি রৌদ্র কাতরতা—

তার চেয়ে স্থায়ী সত্য অন্য আর কিছুতে দেখি না।’

(জীবনের চেয়ে বেশি রৌদ্র কাতরতা : রণজিত নিয়োগী)

.

রবিন পারভেজ তাঁর ‘রা’-এর প্রতিটি সংখ্যাতে সমসাময়িক ঘটনা প্রবাহ নিয়ে সম্পাদকীয়তে তুলে ধরেছেন তাঁর নিজস্ব মনোভঙ্গি। ছোটকাগজের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সস্পাদককে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয়, করে যেতে হয়। এতে করে যেমন কাগজের স্বাতন্ত্র্যবোধ জারি থাকে, তেমনি লড়াই সংগ্রামের দালিলিক উপাত্ত সঞ্চিত থাকে পরবর্তী তরুণদের পাথেয় হিসেবে—থাকে স্থানিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসচর্চার কাঁচামাল হিসেবে।

যুদ্ধাপরাধী বিচার জনগণ ও শাহবাগে ‘আঁধারে আলোর আধার’ শিরোনামে রবিন লিখেছেন, ‘শাহবাগ দু’টি বার্তা আমাদের বড় দু’টি দলের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়—১. যুদ্ধাপরাধী বিচার নিয়ে দলীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো অঙ্ক চলবে না; ২. এ দেশের মানুষ ৪২ বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রশ্নে একাট্টা। শাহবাগ নিয়ে যে বিতর্ক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিতর্ক। শাহবাগ এই বিতর্কের আঁধারে আলোর আধার। আমাদের রাজনীতিবিদদের এই আলোতেই হাঁটতে হবে।’ (২০১৩/এপ্রিল সপ্তম সংখ্যা)।

কবি কবিতা নিরীক্ষা গোষ্ঠীবাদীতা ইত্যকার বিষয় নিয়ে সম্পাদকের যে মনোভঙ্গি তা নিয়ে ২০১১ সালের মে মাসে প্রকাশিত পঞ্চম সংখ্যায় সম্পাদক লিখেছেন, ‘নানান বিতর্ক সত্ত্বেও এই সময়ের কবিতা কিছু নিয়ম-কানুন-শাসনের প্রথাগত কৌশল ক্রমশ পরিত্যাগ করে বহুমাত্রিক বোধ ধারনে নিয়ত নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে অগ্রসরমান। তবে বিতর্কের জায়গাটিও অমূলক নয়। আছে হতাশার জায়গাটিও।

নিরীক্ষার নামে অহেতুক দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি কিংবা নিরীক্ষার ছলে দায়িত্ব জ্ঞানহীন কথকতার্ণ (যা নিছক কথার ফুলঝুড়ি মাত্র) বাক্যগুচ্ছকে কবিতা বলে চালিয়ে দেয়ার নমুনাও দৃষ্টিগোচর হয়।

এ মাত্রার কবিকুলরাই থাকে গোষ্ঠীবদ্ধ। ব্যক্তি স্বার্থকে গোষ্ঠী স্বার্থ বানিয়ে বেসুমার যশপ্রার্থী এরা নিজেরাই নিজেদের সাক্ষাৎকার মুদ্রণ, পরস্পর পরস্পরের লেখায় খাপছাড়া—অনেক ক্ষেত্রে রুচিজ্ঞানহীন আলোচনায় ভরে তোলে নিজেদের ঢাউসাকৃতি প্রকাশনা।

ভাবতে থাকে কাব্য অঙ্গনে এরাই তালুকদার। অঙ্গন আবার এদের কারো কারো ভাবনায় দু’ভাগে বিভক্ত—রাজধানী আর মফস্বল। চোখে মুখে এক ধরনের প্রজ্ঞাদ্যুতি জাগিয়ে ‘মফস্বলের কবিতা’ বাক্যটি উচ্চারণে এরা প্রায়শ তৃপ্তিবোধ করে। জায়াটি হতাশার। সুস্থধারার শিল্পচর্চার জন্য পীড়াদায়ক।

আমরা মানি—মফস্বল-ই কাব্যচর্চার বৃহৎ পরিসর। এই পরিসরে কবিতা নিয়ে ভাবতে আমরা গর্ববোধ করি।’

স্থানিক পরিসরে সম্পাদকের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার জন্য এই বড় উদ্বৃতি। দরকারও বটে। রাজধানী-মফস্বল দুই মেরুকরণের প্রভাবে রাজধানী কেন্দ্রাতিগের কারণে পরিধি হয়ে উঠেছে ধু ধু বালুচর। পদ্য লিখে লিখে হাত মকশো করার প্রান্তিকের প্রান্তিক।

বিকেন্দ্রিকরণের কথাবার্তা সংবিধানের পাতা থেকে আর পরিধির দিকে মুখে মুখে ফেরী হয়েছে বটে; কিন্তু স্থানিক ক্ষমতায়নের কোনো বিকাশ ঘটেনি। হোক সে স্থানিক প্রশাসনিক কাঠামো। কার্যক্ষেত্র কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে সব।

কাজে কাজেই কী শিক্ষা, কী চিকিৎসা, কী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা-চর্যা—কোনো ক্ষেত্রেই পরিধির ক্ষমতার আনুভূমিক বিস্তার ঘটেনি।

যখন টাউন শেরপুরে কোনো সম্পাদক বুকফুলিয়ে বলেন ‘মফস্বলই কাব্যচর্চার বৃহৎ পরিসর’ শুনতে দম্ভোক্তি লাগলেও, রাজধানীকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোর রাজনীতি বিন্যাসের সাথে স্থানিক ক্ষমতা বিন্যাসের যে ভেদ—তার প্রতিই তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করেন।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব । ১৯তম পর্ব । ২০তম পর্ব । ২১তম পর্ব । ২২তম পর্ব । ২৩তম পর্ব । ২৪তম পর্ব । ২৫তম পর্ব । ২৬তম পর্ব । ২৭তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...