shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৮তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৮তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২৮তম পর্ব

আটাশ

স্থানিক সাহিত্যচর্চার পাটাতন শুধু সাহিত্য পত্রিকা বা স্মরণিকা নয়। আরো কিছু পাটাতন জারি থাকে সবসময়। সেটি স্থানিক সাহিত্যচর্চার বৈশিষ্টও বটে। হোক সে জেলা সমিতির প্রকাশনা বা কোনো ব্যবসায়ী সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদনের ক্রোড়পত্র অথবা প্রেসক্লাবের সাময়িকী।

শেরপুর সাংবাদিক পরিষদের মুখপত্র পত্রিকা দুই হাজার দুই সালে কবি আরিফ হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত। সেখানে লিখেছেন—সুজন সেন, আবদুর রেজ্জাক, কায়রুজ্জামান কামাল, কাকন রেজা প্রমুখ। বাঙালি কবিতা অন্তপ্রাণ। কাজে কাজেই কবিতা, ছড়া থাকবে না সেটি হয়?

স্থানিকে ব্যবসায়ী সমাজের সংগঠন চেম্বর অব কর্মাসের বার্ষিকীতে আয়-ব্যয়ের দাখিলার পাশাপাশি কবিতা, ছড়া প্রকাশিত হয় প্রেসক্লাব বা ক্রীড়া ক্লাবের সাময়িকীতে কখনো কখনো ইতিহাসচর্চা হয়। খেলাধূলার কথা ওঠে আসে। এ ছাড়া আছে পরিবেশবাদী পাখিবান্ধব পত্রিকা। স্থানিকে এ ধরনের চর্চা সার্বিক সাহিত্যচর্চার পটাতন বিনির্মাণে ভূমিকা রাখে।

‘আমাদের পাখি’ শেরপুর বার্ড কনজারভেটিভ সোসাইটির অনিয়মিত সাময়িকী। সুজয় মালাকার ও শহীদুজ্জামানের প্রযত্নে ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রকাশ। ‘মানুষের মাঝে পাখিদের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলাই’ তাদের লক্ষ্য। যদিও তাদের ভাবনায় রয়েছে পাখি ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণা আর স্থানিক পাখিদের পরিচিতকরণের জন্য স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেবেন বলে জানালেন শহীদুজ্জামান।

শুরুতে ছিল ‘পাখি পল্লব’ সংগঠন। গুটি কয়েক বন্ধুদের কার্যক্রম। গত শতাব্দীর আটের দশকের শেষের দিকে পাখির প্রতি ভালোবাসা দিয়ে যাত্রা। বললেন সুজয়। তারই ধারাবাহিকতায় পাখি ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আর প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার্থে আজকের বার্ড সোসাইটি। সদস্য সংখ্য তেমন বাড়েনি। তবে কর্মতৎপরতা আগের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। ‘মানুষের চেয়ে পাখিদের সাহচর্য বেশি অনুভব করেন’—সুজেয় নিজেই জানালেন।

জীব প্রজাতি বৈচিত্র ও একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য প্রাণ ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশ জরুরি। শিল্পায়নের অভিঘাতে পৃথিবী হুমকির মুখে। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কায়নে ভেতর আমি আমরা কেবলি ব্যক্তিস্বার্থবাদী। হৃদয় দিয়ে হৃদয় অনুভব ভোগবাদিতার কারণে বির্পযস্ত। ব্যক্তিমুনাফার দিকে অভিমুখীতার কারণে নির্বিচারে হত্যা করছি বুনোপাখি।

আব্দুল কাদির লিখেছেন, ‘প্রতিনিয়ত কমছে পাখির সংখ্যা। বিশেষ করে বড় প্রজাতির পাখির সংখ্যা হুমকির মুখে… একদিকে যেমন রয়েছে লোভী শিকারী, তেমনি আছে শখের শিকারী।’ এই দৃশ্যপট শুধু স্থানিক নয়, সমগ্র দেশে। তবে এ কথা বলা যায়, আগের তুলনায় পাখি সচেতনা বাড়ছে। পাখি হত্যার বিরুদ্ধে কণ্ঠ জোরদার হচ্ছে।

স্থানিক পর্যায়ে বার্ড সোসাইটি প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি জনসচেতনা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। উদ্যোগটি ভালো। প্রসংশার দাবিদার।

সংগঠন চর্চা যে কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিকের কাঠামো বিনির্মাণের ভিত্তি। স্থানিকচর্চা সামষ্টিক চর্চাকে বেগবান করে। নয়ের দশকের আগে যে তরুণটি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ব্রত নিয়ে নাটকের দল কিংবা খেলাঘর কিংবা পাড়ার ক্লাবে বিচিত্রানুষ্ঠান করবে বলে আগ্রহীদের খুঁজছে কিংবা নিদেন পক্ষে মায়াবি চোখ নিয়ে গোপনে কবিতা লিখত আর ভাবত অমর একুশে একটি স্মরণিকা বের করবে, করছে। সেই ধারাবাহিকতা পরবর্তী দশকে আর বজায় থাকেনি।

নয়ের দশকের পর তরুণদের সংগঠনচর্চা মূলত হয়ে গেল কোচিং সেন্টার গড়ার নেশা। কাঁচা টাকার নেশা। একদিকে, নিজের ছাত্রজীবনকে যেমন উপভোগ করতে পারল না, তেমনি ছাত্রমাস্টার হয়ে বকবক করে করেই অবশেষে কিন্ডারগার্টেনের মাস্টার হলো অথবা স্থানিক রাজনীতির লেজুর ধরে ঘোরপাক খেতে শুরু করল।

অন্যদিকে, স্কুল পড়ুয়ার দল কোচিং-পরীক্ষার চক্রে হারিয়ে ফেলল নিজের রঙিন শৈশব। স্কুলভিত্তিক যে সকল কার্যক্রম ছিল একদা, যেমন : নজরুল-রবীন্দ্র-সুকান্ত জয়ন্তী উৎসব, জাতীয় উৎসবকেন্দ্রিক দেয়ালিকা প্রকাশ বা স্কুলের স্মরণিকা, কিংবা স্কুলের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বা মিলাত বা সরস্বতীপূজা বা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ইত্যাদি প্রাইভেট কোচিংয়ের চাপে তাপে ভাপে এমন এমন তৎপরতায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ কমে গেল।

কমে গেল ‘আউটের বই’ পড়ার প্রবণতা। জেলাভিত্তিক পাঠাগার থাকলেও, উপজেলা বা ইউনিয়ন ভিত্তিক কোনো পাঠাগার ঘরে উঠল না।

কেননা স্কুলই আতুরঘর। এখানেই জন্ম নেয়া শিশুটি আগামী দিনে কোনো-না-কোনো ক্ষেত্র নেতৃত্ব দিবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছাত্র সংগঠনও কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি।

সবকিছু রাজনৈতিক বাতারনের কারণে সংগঠনচর্চাও কমে গেল। থানা বা ইউনিয়ন স্তরে তো আরো করুণদশা। মানুষের সাথে মিলবার ও মেলাবার প্রশস্ত জমিনই তো সংগঠন। মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়াবার অভিপ্রায় সংগঠনচর্চার ভেতর বিদ্যমান থাকে।

বর্তমান দৈশিক-বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। ক্রমশ পর্দার অন্তরালে সরে যাচ্ছে আমাদের চেনা-জানা ভুবন। পুঁজির দাপটে বিপন্ন আমাদের পৃথিবী। পরিবেশবাদীরা মুখর সারাবিশ্বে। ‘If the earth dies, we die.’

শেরপুর বার্ড সোসাইটিকে আমি সাধুবাদ জানাই। জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষে তাদের যে কর্মতৎপরতা তা প্রসংশনীয়। সাংগঠনিক চর্চা ছাড়া প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা যাবে না। এই ধরনের সংগঠন গণসচেতনা সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আমাদের প্রয়োজন আরো আরো সংগঠন। উচ্ছ্বল স্বপ্নবাজ তরুণদের সংগঠন। হোক সে বার্ডক্লাব বা খেলাঘর বা কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বা পশুপ্রেমিদের সংগঠন। সকলের সাথে আমাদের অবারিত যোগ আছে। প্রাণ ও প্রকৃতি একে-অপরের প্রতি নির্ভরশীল। প্রয়োজন নতুন অনুভব। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

.

This we know

All things are connected

Like blood

Which unites one family…?

Whatever befalls the earth?

Befalls the son and daughter of the earth.

Man did not weave the web of life :

he is merely a strand in it.

Whatever he does to the web,

He does to himself.

(Chief Seattle)

.

এই শেরপুরই রয়েছে প্রায় ১৮০ প্রজাতির পাখি। আমি পাখি চিনি না। চড়ুই গেরস্থ ঘরের স্বজন। যদিও চড়ুই আজ বিপন্ন। টিনের দু’চালা ঘর—এদিকে হাই রাইজিং ভবন হচ্ছে, অন্যদিকে মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের কারণে ঘরহারা বিপন্ন চড়ুই।

চড়ুইয়ের ত্রস্তগতিই আমার ভালো লাগে। বার্ড সোসাইটির সাময়িকীতে অনেক পাখির নাম ও ছবি আছে। আগে সব নাম জানতাম না। চিনতাম না মোটেও। শেরপুরে যে পাখিগুলো রয়েছে, তা নিম্নে সাময়িকী থেকে তুলে দিচ্ছি পাঠকদের জন্য।

দোয়েল, শালিক, ফিঙে, সোনাবউ পাখি, গাছচড়ুই, সিপাহী বুলবুল, বাংলা বুলবুল, স্যামা, হলদে বউ, মুনিয়া, জলপাই পিঠ তুলিকা, খয়ড়া হাঁড়িচাচা, মেটেঠোঁট ফুলঝুরি, বন ছাতারে, উদয়ী দোয়েল, কালাঘাড় রাজন, ধলাকোমড় শ্যামা, পাতিময়না, ধনেশ, তিলা ঘুঘু, ঝুঁটি শালিক, গাঙ শালিক, হট টিটি, ছোট নথজিরিয়া, ছোট সহেলি, লালঘাড় পেঙ্গা, ছোট মাল পেঙ্গা, পাতি শরালি, খয়রা পাখ পাপিয়া, পাকরা পাপিয়া, পাকরা মাছরাঙা, ধানি তুলিকা ইত্যাদি।

এতো এতো পাখি শেরপুরে!! এক টিয়ার এতো বাহার! চার প্রজাতির ছোট পাখি মাঝরাঙা!

.

‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

একটি শিশির বিন্দু।।

(স্ফুলিঙ্গ ৩৪ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

.

মদনা টিয়ার বাহারি রঙের কথা লিখেছেন সুজয়। ‘শাল গাছের পাতার রঙের সাথে মদনা টিয়ার গায়ের রঙ মিলে একাকার।… দেহ সবুজ, লালচে পেট, মাথা ধুসর, পুরুষ পাখির ওপরের ঠোঁট লাল, নিচের ঠোঁট কালো। আর স্ত্রী মদনা টিয়ার উভয় ঠোঁট কালো। ঠোঁটের ওপর চোখ থেকে কপাল পর্যন্ত কালো ব্যাণ্ড, মনে হয় ঠোঁটের ওপর গোঁফের বাহার। চোখ হলুদ, লেজে বেগুনি নীল, লেজের আগাটুকু আবার হলদে। পা সবুজ আর হলুদে মিশ্রণ।’

মদনা টিয়াও আমি দেখিনি। সুজয়ের বর্ননা পড়তে পড়তে যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল মদনা টিয়া। হয়তো কোনো শাল বনে দেখব তাঁকে। কিন্তু সুজয় মালাকারের আশঙ্কা শৌখিন শিকারী বা লোভী শিকারীর বন্দুকের তাক থেকে ‘শেষরক্ষা হবে তো শেরপুরের মদনাটিয়া?’

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব । ১৯তম পর্ব । ২০তম পর্ব । ২১তম পর্ব । ২২তম পর্ব । ২৩তম পর্ব । ২৪তম পর্ব । ২৫তম পর্ব । ২৬তম পর্ব । ২৭তম পর্ব  । ২৮তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...