শনিবার, মার্চ ৬সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৩৬তম পর্ব

1 0
Read Time:12 Minute, 27 Second
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৩৬তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৩৬তম পর্ব

ছত্রিশ

‘অরুনোপল’ এক স্বপ্নবাজ তরুণদের সংগঠন। মানবিক চেতনায় উজ্জ্ববীত একটি সামাজিক সংগঠনের প্লাটফর্ম। দলের কাণ্ডারী রমিজুল ইসলাম লিসান। ‘we have committed to bring change in socioeconomic affairs.’ লিসান তাঁর অরুনোপল ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন, ‘AUROPPLE is a people’s oriented local entrepreneurship.’

অরুনোপলের সাহিত্য সংস্কৃতির সমাচার ‘উৎস্বর্গ’ প্রকাশিত হয় ১ পৌষ ১৪২৫ সালে উদ্বোধনী বিশেষ সংখ্যা হিসেবে। যদিও ‘২০১৩ সালেই উৎস্বর্গের যাত্রা ভাঁজপত্র আকারে, সীমিত পরিসরে।’

‘উৎস্বর্গের’ আয়োজন চমৎকার। প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশে আছে যেমন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্‌দীন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, আহসান হাবীব, হুমায়ূন আজাদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, তেমনি আছে টাউন শেরপুরের এই দশকের তরুণ কবিদের কবিতা। হাসান রাকিব এই সময়ের তরুণ কবি। কবিতা ও ব্যান্ড—দুয়েই প্রবল টান।

.

ক.

উত্তেজিত করবে?

তুষার হয়ে যাবো, শুভ্র।

চুপটি করে বসে থাকবো হিমালয়ের বুকজুড়ে।

আকড়ে ধরতে চাও?

জল হয়ে যাবো, স্বচ্ছ।

বঙ্গোপসাগর হয়ে ছড়িয়ে পড়ব পৃথিবীর সব মহাসমুদ্রে

(শুভ্র)

খ.

অতঃপর লড়াই হলো, সংঘর্ষ হলো,

একটি কবর চাপা পড়লো অন্য একটি

পরিবর্তিত হল মৃত মানুষের নাম

(পরম্পরা)

.

হাসান রাকিবের তবু ‘নির্দিষ্ট কোনো ঠোঁটের প্রতি আমার অভিযোগ নেই’ কেননা তরুণ জারি রাখতে চায় চিরকালীন দাবি, ‘সমাজ চায় সমৃদ্ধি মনন চায় মুক্তি।’ তন্ময় সাহার কবিতাও ক্রমশ নিজস্ব স্বর অর্জন করছে। তন্ময় সাহা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন দুইটি কাব্যগ্রন্থ : ‘জাতিস্মর’ (২০১৮) ও ‘ডাক বাক্সের তলার ধুলো’ (২০১৯)।

.

ক.

জ্যামিতি আবিষ্কার না-হলে কাঁটাতার বলে কিছু থাকতো না,

থাকতো না মালিকানা, পৃথিবীটা সবার হয়ে উঠতো।

(কাঁটাতার)

.

তন্ময় সাহা প্রতিশ্রুতিশীল কবি। মন মননে ধারণ করে আছেন—কাঁটাতার বিহীন সীমা-সীমান্ত-সীমান্তরক্ষী ছাড়া এক অখণ্ড চরাচর মানুষের আবাস ভূমি। তাঁর আরেকটি কবিতায় যেমন লিখেছেন—

.

খ.

এই নদী যা নিঃস্ব হবার ভয়ে

কেঁদে ছিল পুরো একটি জন্ম—

যেখানে একটি মুহূর্ত

একটি জন্মের মতো বৃহৎ

(জাতিস্মর)

.

উৎস্বর্গের আরেক কবি সুরঞ্জন ঘোষ প্রতিশ্রুতিশীল। তিনি লিখেছেন—

.

ক.

আমি ভোরের আগেই মারা যাই,

কাল সন্ধ্যায় সৃষ্ট হই।

তাই বলে ভেবো না আমি কোনো নেশাচর।

সারাদিন সূর্যকে খাই বাদুরকে খাওয়াই।

শিংঅলা জন্তুটার কথা ভাবলে

আমিও ভয় পাই।

(বিষ-বিষয়ক : সুরঞ্জন ঘোষ)

খ.

বেশ কয়েকজন মিলে একা একা হাঁটছিলাম।

সামনের ঝুলন্ত বিস্কুটটা ধরতেই

হঠাৎ কে যেন সুতা ধরে টান দিল

আর অমনি আমরা সবাই নিচে পরে গেলাম।

(অজুহাত : সুরঞ্জন ঘোষ)

.

তিনি নিজেও ‘ক্ষয়’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন ২০১০ সালে। সেটি বন্ধ হয়ে গেলেও, পরবর্তী সময়ে গঠন করেন ব্যাণ্ড ‘নকশাতীত’ (২০১৮)। অরুনোপল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগকে সাথে নিয়ে যে যৌথ Junior Art Competition (JAC) শেরপুর দারোগা আলি পৌর পার্কে অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আয়োজিত ‘আনপ্লাগড মিউজিক্যাল শো’তে অংশগ্রহণ করে নকাশাতীত।

শেরপুরে একটি সংগঠিত ব্যান্ড নকশাতীতে যার লিরিকে যুক্ত হন এই সময়ের তরুণ কবি সম্প্রদায়। সুরঞ্জন ঘোষ ছাড়াও আছেন—মনিরুস সাব্বিন, তন্ময় সাহা, রকিবুল ইসলাম রকি ও রবিন চক্রবর্তী। এই তরুণ তুর্কি দল এই সময় লিখতে আসা এই উত্তর জনপদের প্রতিশ্রুতশীল কবি। আনপ্লাগড মিউজিক্যাল শোতে আরো অংশ নেন ‘শেরপুর ব্যাণ্ড মিউজিশিয়ানের’ সদস্যবৃন্দ।

শেরপুরের তরুণদের একটি প্লাটফর্ম ব্যান্ড মিউজিক। শেরপুরে ব্যান্ড মিউজিকের যাত্রা শুরু স্বাধীনতার পর পরই। নাহিদুজ্জামান ২০০৭ সালে ১১ জন নিয়ে গঠন করেন ব্লাকস্টোন। এই ব্লাকস্টোনই এই প্রজন্মের তরুণদের মাঝে দাহিকা শক্তি হিসাবে কাজ করেছে।

‘সরলপুর’ ব্যান্ডের যাত্রা ২০০৯/১০ সালে। প্রতিষ্ঠাতা আতিকুল ইসলাম তপন। ২০১৭ সালে গঠিত হয় সোলক্রিক। ২০১৮ সালের ১ বৈশাখে শেরপুর কলেজে সোলক্রিক কর্তৃক আয়োজিত ব্যান্ড মিউজিকে অংশ নেন সোলক্রিক, নকশাতীত ও আওয়াজ।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রতি দশকেই ব্যান্ড গঠন ও তৎপরতা জারি থেকেছে। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে ‘ত্রিসপ্তক’ সেই ব্যান্ড বা পপ সঙ্গিতের যাত্রা বিন্দু।

পপ গুরু আজম খান ও তাঁর সমসাময়িক ফেরদৌস ওয়াহিদরা সারা বাংলাদেশে এই নতুন সঙ্গীতের সুর ও স্বর ছড়িয়ে দিলেন সবখানে। হয়তো ত্রিসপ্তক সেই ধারাতেই প্রভাবিত। ত্রিসপ্তক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গোলাম রহমান রতন লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক কালে নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে কতিপয় তরুণের প্রচেষ্টায় ‘ত্রিসপ্তক’ গঠিত হয়েছে। পপ সঙ্গীতের নতুন জগতে এদের অবাধ বিচরণ প্রবণতা লক্ষণীয়।৯

তবে এ-কথা ঠিক, ব্যাণ্ড সঙ্গীতের বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টের সমাহার ঘটান ‘রেইনবো’ ব্যাণ্ড। গত শতকের আটের দশকের মাঝামাঝি ‘রেইনবো’র যাত্রা শুরু। কবি কাকন রেজার প্রযত্নে। ‘রেইনবো’র প্যাড ভোকালে উজ্জ্বল, ড্রামে নন্দ কিশোর দে, গিটারে সাধন, সমীর ও কী বোর্ডে ছিলেন কাকন রেজা। তাঁরা টাউন হলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা ছাড়াও, স্কুল ও কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

সেই সময়ে নবীনবরণ সারা বাংলাদেশেই বেশ গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হতো। স্কুল পেরিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে পা দেবার এই লিঙ্করোডেই তারুণ্যের উচ্ছাস নবীনবরণ। রেইন বো ফোক সংস ও কাভার সংস দিয়েই মাতিয়েছেন টাউন শেরপুরের গান পাগল মানুষদের। এমন কি সেই সময়ে অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক তিন আনীর মালিঝি কান্দা স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রেইন বো’র অংশগ্রহণ সবার দৃষ্টি কেড়েছিল।

নব্বইয়ের শুরু দিকে মজিবর রহমান, আমিনুল ইসলাম লোকন ও আনন্দ সাহা মিলে গঠন করেন ‘তৃষ্ণা ব্যাণ্ড’। আরো ছিলেন ফাহমিদা ফারুক ও মিতুল। ২০০০ সালে তপন সিরাজী, নিপু, নয়ন ও সাজুদের নেতৃত্ব গড়ে ওঠে ব্যান্ড গায়েন।

তাদের মৌলিক গান নিয়ে সে সময় একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। ১. ঐ ছবিটি তাকিয়ে আছে তাকিয়ে আছে আমার পানে; ২. তুমি আছো ছুঁয়ে যাওয়া দিগন্তে শেষ নীলিমাতে—ইত্যাদি গানগুলো সে সময় জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং বর্তমানেও তরুণদের মাঝে সেই গানগুলো সমান জনপ্রিয়।

অলক কর শেরপুর ব্যাণ্ড মিউজিকে একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। তিনি একাধারে ভোকাল, কম্পোজার, গীতিকার যেমন, তেমনি স্থানিক বিভিন্ন ব্যাণ্ডের সাথে কাজের যোগসূত্রতা রয়েছে। তিনি ‘প্রশ্নবীর’ নামেও একটি ব্যান্ড গঠন করেন। এই প্রশ্নবীরকে আর্বতিত করে তিনি তাঁর মিউজিক তৎপরতা জারি রেখেছেন।

রংমহল (২০১৯) ব্যাণ্ড শেরপুর কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী গড়ে তুলে। অন্যদিকে, ভিক্টোরিয়া স্কুলের ছেলেরা গড়ে তুলে Sector Eleven (২০১৯) নামে ব্যাণ্ড। তারা কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তারুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছে।

রমিজুল ইসলাম লিসানের ‘উৎস্বর্গ’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম ব্যান্ড মিউজিকে। ছোটকাগজ ও সঙ্গীতের চাতাল মূলত তরুণদের প্রকাশের দুই রূপমাত্র। সারবেত্তার দিক থেকে একই উৎসমূল। প্রকাশ আলাদামাত্র। লক্ষ্য অভিন্ন ‘মননের মুক্তি’।

এক তরুণ স্বর নির্মাণ করছে অন্য তরুণ সুরে তাকে মুক্তি দিচ্ছে। কিংবা এক তরুণের ভেতর সুর ও স্বর খেলছে সৃষ্টি সুখের উল্লাস। ছোটকাগজ আর মিউজিক একই মুদ্রার এপিঠ ও পিঠ।

কিন্তু স্বপ্নের সমান বড় লিসান তাঁর স্বপ্ন ও কর্মের জগৎ থেকে ২০ জানুয়ারি, সাল ২০২০—হারিয়ে গেলেন। তিনি নেই। তিনি নেই হয়ে আছেন আমাদের মাঝে—আমাদের স্মৃতি কোঠায়।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব । ১৯তম পর্ব । ২০তম পর্ব । ২১তম পর্ব । ২২তম পর্ব । ২৩তম পর্ব । ২৪তম পর্ব । ২৫তম পর্ব । ২৬তম পর্ব । ২৭তম পর্ব । ২৮তম পর্ব । ২৯তম পর্ব । ৩০তম পর্ব । ৩১তম পর্ব  । ৩২তম পর্ব । ৩৩তম পর্ব । ৩৪তম পর্ব । ৩৫তম পর্ব । ৩৬তম পর্ব

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *