shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৬ষ্ঠ পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৬ষ্ঠ পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৬ষ্ঠ পর্ব

চার

গত শতাব্দীর ছয়ের দশক বাঙালি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ে পরিচিত হবার দশক। স্বাধীকার অর্জনে ব্যক্তি ও সমাজের আলোড়িত হবার দশক। ষাটের তরুণ জাতীয়তাবাদী বা মার্ক্সবাদী হওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো পথ ছিল না। সময়ের আহ্বান—সময়ের বাধ্যবাধকতা তরুণকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছে। শেরপুরের যুব সমাজ তার ব্যতিক্রম নয়।

গোলাম রহমান রতন লিখেছেন, ‘প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখতে গিয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনও করেছি। ষাটের দশকে শেরপুরে সংস্কৃতি চর্চা বলে কিছু ছিল না বললে অত্যুক্তি হবে না। সংস্কৃতিতে ছিল পুরো বন্ধ্যাত্ব।’

এমনিতেই দেশভাগজনিত প্রতিক্রিয়ায় দেশজুড়ে ছিল অস্থিরতা, অন্যদিকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিজস্বতা অর্জনের জন্য ছিল নানা রাজনৈতিক তৎপরতা।

ষাটের দশকে শেরপুরে ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল’ নামে সরকারি পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। মুহম্মদ আখতারুজ্জামান ‘হৃদয়ে হীরা কাকা’ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাকিস্তানি সংস্কৃতি তথা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৌলবাদভিত্তিক এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি তুলে ধরা হতো।’

ষাটের তরুণ ইমদাদুল হক হীরা (১৯৩৪-২০০৭) বাঙালি সংস্কৃতির ধারাকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে গড়ে তোলেন ‘গণসংস্কৃতি সংসদ’। মূলত আর্ট কাউন্সিলের নানা তৎপরতার প্রতিক্রিয়ায় প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী তরুণেরা ইমদাদুল হক হীরার নেতৃত্বে গঠন করলেন ‘গণসংস্কৃতি সংসদ।

আক্তারুজ্জামান লিখেছেন, ‘হীরা কাকার বাসায় প্রথম যে মিটিং হয়, সেখানেই জন্ম হয় এই গণসংস্কৃতি সংসদ’, সময় ১৯৬৮ সাল।

উপস্থিত ছিলেন—শাহেদা বেগম রুনু, সৈয়দ আব্দুল হান্নান, আবুল কাশেম আব্দুর রশিদ, লুৎফর রহমান মোহন, গোলাম রহমান রতন, আমজাদ হোসেন, মুহসীন আলী, সুরঞ্জিত সাহা, নিতাই হোড় নারায়ন হোড়, রণজিত হোড়, তপতী হোড়, জয়শ্রী নাগ, সাহিদা বেগম, পরিতোষ পাল, বিজন কর্মকার, সুষেণ মিত্র মজুমদার, তৃপ্তি দে, চিত্রা মিত্র মুক্তি, আলো চায়না, চম্পা প্রমুখ।

.

গণসংস্কৃতি সংসদের কোনো মুখপত্র ছিল না। সংসদের হাতিয়ার ছিল নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য। শেরপুরে সাংস্কৃতিক চর্চার জমিন বিনির্মাণে সংসদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্য। সংসদের সভাপতি ছিলেন সৈয়দ আবদুল হান্নান ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এমাদদুল হক হীরা।

‘সর্বতোভাবে প্রগতিশীল ও গণমুখী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাই ছিল গণসংস্কৃতি সংসদের উদ্দেশ ও লক্ষ্য’ লিখেছেন শেখ আবদুল জলিল। উনসত্তরে উত্তাল বাংলাদেশ। জলিল বলেন, ‘উত্তাল জনগণের মন ও জীবন প্রতিবাদমুখর। সে সময়ে যা কিছু পাকিস্তানি তার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল গণসংস্কৃতি সংসদ।’

শেরপুরে নাটক চর্চার ইতিহাস বহ পুরনো। নয়ানী জমিদারদের নাট্যপ্রীতি সকলেই জানেন। কেউ একজন হয়তো সেই ইতিহাসের তত্ত্বতালাশ করবেন। তবে এখানে বলে রাখি, এই সংসদ থেকেই প্রথম শেরপুরে ছেলে-মেয়েরা একসাথে নাটকে অভিনয় করা শুরু করেন। সংসদ ছিল নাটক প্রধান সংগঠন।

ছেলে-মেয়েদের যৌথ অভিনয়নের মাধ্যমে ‘প্রবেশ নিষেধ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এ ছাড়া ধনঞ্জয় বৈরাগীর ‘রূপালী চাঁদ’, আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘সংবাদ কার্টুন’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘সংবাদ শেষাংশ’ নাটক মঞ্চস্থ হয়।

মূলত মার্ক্সবাদী তরুণেরাই গড়ে তুলে গণসংস্কৃতি সংসদ। সেই আলোকেই সংসদ পরিচালিত হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর জাতীয়তাবাদী তরুণেরা সংসদ থেকে বের হয়ে গড়ে তুলে ‘কৃষ্টি প্রবাহ’ গোষ্ঠী। বঙ্গাব্দ ১৩৭৭ (১৯৭০) সালে কৃষ্টি প্রবাহের যাত্রা শুরু।

মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আদর্শিকতার কারণেই কৃষ্টি প্রবাহের জন্ম। ডা. আহমেদুর রহমানের বাসায় গণসংস্কৃতি সংসদের সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন থেকে গণসংস্কৃতি সংসদ ভেঙে কৃষ্টি প্রবাহ সৃষ্টি হয়।’ মুহম্মদ মুহসীন আলী সভপতি ও নারায়ণ চন্দ্র হোড়কে সাধারণ সম্পাদক করে প্রবাহের যাত্রা শুরু হয়।

যদিও ছিয়াত্তর সালে কিছু তরুণ ‘কৃষ্টি প্রবাহ’ থেকে বের হয় গঠন করলেন ‘ত্রিসপ্তক’, দীলিপ পোদ্দারের নেতৃত্ব। আরো যুক্ত হলেন—অভিনেতা দেবদাস চন্দ, তবলাবাদক উদয় সাহা, নর্তক কমল পাল।

গোলাম রহমান রতন লিখেছেন, ‘নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে কতিপয় তরুণের প্রচেষ্টায় ‘ত্রিসপ্তক গোষ্ঠী’ গঠিত হয়েছে। পপ সঙ্গীতের নতুন জগতে এদের প্রবণতা লক্ষণীয়।’ তবে ওস্তাদ কানুসেন গুপ্ত কৃষ্টি প্রবাহে প্রশিক্ষক হিসেবে থেকে গেলেন। পরবর্তী কালে এই তরুণেরা শেরপুরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে।

.

‘কৃষ্টি প্রবাহ’ একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। গান-নৃত্য-বাঁশি-তবলা শেখার প্রতিষ্ঠান। শেরপুরে নাট্যানুষ্ঠান, প্রীতি সন্মীলনী জয়ন্তী উৎসব ছাড়াও বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক পত্রিকা প্রকাশ করেছে। এমনকি ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদ খননের স্বেচ্ছাশ্রম, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কৃষ্টি প্রবাহ।

কৃষ্টি প্রবাহের অভিনীত নাটকগুলো হলো : মেঘে ঢাকা তারা, লবণাক্ত, সকালের জন্য, জীবন রঙ্গ, ফাঁস ও নিষ্কৃতি। সাতের দশকে কৃষ্টি প্রবাহ সাংস্কৃতিক চর্চায় টাউন শেরপুরে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

দেশভাগের কারণে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মী দেশত্যাগের কারণে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে ভাঁটা পড়েছিল কৃষ্টি প্রবাহের নানামুখী কায়কারের টাউন শেরপুরে আবারো সাংস্কৃতিক চর্চার জোয়ার আসে। কৃষ্টি প্রবাহ একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার প্লাটফর্ম। সেখানে নাচ-গান-অভিনয়-তবলা বাজানো থেকে শুরু করে বাঁশী শেখানোর কার্যক্রম ছিল।

১৯৭৪ সালে কৃষ্টি প্রবাহ প্রকাশ করে ‘শহীদ স্মরণিকা’ বুলেটিন। সম্পাদক সুশীল মালাকার। সম্পাদক লিখেছেন, ‘একটা জাতির ঐশ্বর্য প্রতিভাত হয় ভাষার মাধ্যমে। বাঙালি জাতির প্রধান সম্পদ হচ্ছে তার মুখের ভাষা; প্রাণের ভাষা—বাংলা ভাষা। এই ভাষাতেই সে ঐশ্বর্যবান। কিন্তু সেই ঐশ্বর্যবানের সংখ্যা কত?’

Little Magazine

সম্পাদক সুশীলের একটি মৌলিক প্রশ্ন যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ১৯৫২ থেকে ২০২১। অনেক বছর পেরিয়ে এসেছি আমরা। বাংলা ভাষার ঐশ্বর্যে অবগাহন করতে পারিনি। পারিনি ভাষা মুক্কির চেতনায় ঋদ্ধ হতে। প্রভাত ফেরিতে যাচ্ছি, কালো ব্যাজ ধারণ করছি। পারিনি বুঝতে যে ভাষামুক্তি কথাটা শুধুমাত্র বাংলা ভাষা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সকল ভাষার জন্য সমান সত্য।

যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ একদিন নিপীড়নের শিকার—সেই ভাষাভাষী মানুষেরা আজ অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষার উপর আধিপত্য জারি রেখেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা এখন সংকটাপন্ন। এটা একুশের চেতনা নয়। হারিয়ে যাচ্ছে বহু ভাষা।

বহুভাষা সংস্পর্শে জীবন পায় বহুরৈখিকতার স্বাদ। একুশের চেতনা সকল ভাষার বিকাশের চেতনা। একুশের চেতনা সকল ধরনের আধিপত্য বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তি।

.

কৃষ্টি প্রবাহের মুখপত্র ‘প্রবাহ’ অনিয়মিত দিবসভিত্তিক পত্রিকা। ১৯৭৪ সালের শহীদ সংখ্যা বুলেটিনে সুনীল বরন দে’ তার ‘শেরপুরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি অটোক্রেসির বিরুদ্ধে যুগের যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য যখন আত্মস্বাতন্ত্র্য চেতনায় রূপ নিলো—তখনই বাংলা সংস্কৃকিতে বিপ্লবের সূচনা হলো।’

‘অনেক অন্ধকারকে বুকে তুলে নিয়ে

সূর্যের আলোকে

তোমাকে অনেক খুজেছি

ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে

জীবনে কি পাইনি—কি পেয়েছি?’

(মুক্তির আলোকে তোমাকে/ উদয় শংকর রতন)

সম্পাদক সুশীল ‘প্রবাহ’ ছাড়াও স্বাধনীতার পূর্বে ‘দখিনা’ নামে আরেকটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সুশীল মালাকার লিখেছেন, ‘১৯৬৭ সালে আমি ও মোজামেল হকের যৌথতায় ‘দখিনা’ নামে নিউ প্রেস থেকে একটি মাসিক পত্রিকা বের হয়। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে পত্রিকাটির একটি মাত্র সংখ্যা প্রকাশিত হবার পরই বন্ধ হয়ে যায়।’

সুশীল মালাকার রাজনৈতিক কারণটি কী তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি। করলে হয়তো বোঝ যেত মফস্বলে সাহিত্য পত্রিকা করার প্রতিবন্ধকতার মাত্রার ধরন-ধারণ। ‘দখিনা’ ছাড়া সুশীল কিশোর বয়সে আরো একটা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, ‘১৯৫৭-৫৮ সালে আমি ও অধীর চন্দ্র দাসের সম্পাদনায় ও আবুল কাশেমের সহযোগিতায় ‘কিশোর’ নামে হাতে লেখা একটি পাক্ষিক পত্রিকা কিছুদিন প্রকাশিত হয়েছিল।’

(চলবে) ৬ষ্ঠ পর্ব

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ২য় পর্ব

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৩য় পর্ব

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৪র্থ পর্ব

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৫ম পর্ব

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৬ষ্ঠ পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...