shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

সাত

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী শেরপুর জেলা সংসদের প্রকাশনা অনিয়মিত হলেও, যে কটি প্রকাশনা করেছেন সবগুলোতে তুলে ধরেছেন স্থানিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির পসরা—হোক সে কবিতা বা প্রবন্ধ বা স্মৃতি কথকতা।

১৯৬৮ সালের অক্টোবর ২৯ তারিখে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী। উদীচীর ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে জেলা সংসদ প্রকাশ করে ‘বজ্রে বাজে বাঁশী’, ১৯৮৬ সালের ২৯ অক্টোবরে। এটি উদীচীর তৃতীয় প্রকাশনা। তবে প্রকাশনার নাম চিহ্ন বারবার পাল্টিয়েছে। কখনো ‘অঙ্গিকার’ কখনো ‘মৃৎ’।

উদীচীর আর্দশ ও লক্ষ উদ্ধৃত করে এ সংখ্যায় সম্পাদকীয় লেখেন কবি ও সম্পাদক রণজিত নিয়োগী ও উদয় শংকর রতন। আগ্রহী পাঠকের জন্য তুলে ধরছি। ‘জীবনকে সুন্দর ও সমাজকে প্রগতিমুখী করা শিল্পীর মৌলিক ও সর্বপ্রধান দায়িত্ব।

যেহেতু শিল্পীগণ সমাজ বিচ্ছিন্ন কেউ নন, যেহেতু শিল্পী সমাজের সন্মিলিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে—সমাজ প্রগতির পথ রুদ্ধ করে রাখা যুগ প্রাচীন সামাজিক সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণা ও অবশেষ সমূহ নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব এবং এই ভাবে জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশের পথ সুগম করা এবং এর মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সুখী সুন্দর দেশ গড়ার কর্মপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব।’

উদীচীর ‘বজ্রে বাজে বাঁশী’ প্রকাশনায় কবিতা ছাড়াও ছিল নিন্মোক্ত বিষয়—

১. ‘আমার ছোড়দা : সত্যেন সেন’ জ্যোৎস্না নিয়োগী।

২. ‘শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস : সংশপ্তক’—সুধাময় দাস।

৩. ‘আর নয় যুদ্ধ’ মুহাম্মদ আবু তাহের।

৪. ‘একুশের ভূমিকা’—শেখ জিনাত আলী।

৫. ‘বাংলা উপন্যাস ও ভাষা আন্দোলন’—সুধাময় দাস

৬. ‘নানকার বিদ্রোহ’—রবি নিয়োগী।

স্থানিকতার প্রেক্ষিতে শেরপুরে ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চার জায়গাটি একেবারে সংকীর্ণ নয়। কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কখনো গোষ্ঠীবদ্ধতার ভেতরে চর্চা কম বেশি হচ্ছিল। কিন্তু বেগবান হয়নি।

‘একদা ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত একটি উপজাতি অধ্যুষিত জনপদে বিদ্যোৎসাহী কতিপয় জমিদারদের প্রচেষ্টায় সাহিত্য চর্চার যে বিকাশ শুরু হয়েছিল,’ অধ্যাপক মোস্তফা কামাল তার ‘সাহিত্যে শেরপুরের অবদান’ নিবন্ধে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যক্রমে আধুনিক যুগে তা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি।’

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

উদীচী একটি আর্দশভিত্তিক শ্রেণী সচেতন শিল্পী গোষ্ঠী। একটি শ্রেণী-বর্ণহীন মানব সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে চলছে। উদীচীর সাংস্কৃতিক তৎপরতা মূলত রাজনৈতিক তৎপরতার উল্টোপীঠ।

তাঁর গান কবিতা কিংবা নাটক যে মাধ্যমেই কাজ করুক না কেন উদীচীর লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। ব্যক্তিমানুষের মানস গঠনে এই শিল্পী গোষ্ঠী সদা সক্রিয়। শিল্পের জন্য শিল্প নয় বরং জীবন জন্য শিল্পের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।

উদীচীর কর্মতৎপরতার অনেকাংশজুড়ে রয়েছে নাটক। শ্রেণী সচেনতা তৈরিতে নাটক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেরপুর জেলা শাখা গঠিত হবার পর পরই উদীচী তাঁর নাটক নিয়ে হাজির হয়েছে বারবার। নাটক শ্রেণী সংগ্রামের হাতিয়ার।

উদীচীর নাটক পরিচালনায় নানা সময়ে বিভিন্ন জন এগিয়ে আসেন। আসেন শিব শংকর কারুয়া। গত চার দশক ধরে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন—কখনো অভিনয়ে, কখনো নির্দেশনায়। উদীচীর ব্যানারে তাঁর নির্দেশিত নাটক ‘খেলা খেলা’ ১৯৯১ সালে উদীচীর কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হয়।

এ ছাড়া মমতাজ উদ্দীনের ‘বর্ণচোর’ (১৯৮৫), সালাম সাকলাইনের ‘চোর’ (১৯৯২), ‘ফাংশান’ (১৯৮৫), ‘জনৈকের মহাপ্রয়াণ’ (১৯৮৬), ‘মরা’ (১৯৮৬) ইত্যাদি নাটক তিনি সফল মঞ্চায়ন করেন।

নাটক একটি সমন্বিত শিল্প। চারু ও কারুর সংমিশ্রণ। স্থানিকে নাটকচর্চার স্পেস বিকশিত হয়নি। এরই মাঝে এখানকার নাট্যপ্রেমিদের কাজ করে যেতে হয়। কখনো নাটকচর্চা সহজ ছিল না। এ প্রজন্মের পরিচালক শিব শংকরদের এইগুলো মোকাবেলা করেই এগুতে হয়েছে। ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতাই তাদের প্ররোচিত করে নাট্য আন্দোলনে যুক্ত হতে।

শিব শংকর কারুয়া ব্যক্তিগত আলোচনায় তাঁর নাটকচর্চা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার এইরকম আরেকটা ভালো লাগার কাজ হচ্ছে অভিনয় করা। ফোর ফাইভে যখন পড়ি তখন থেকেই অভিনয় করি। বাড়িতে ছোটরা শাড়ি চাদর দিয়ে স্টেইজ পর্দা বানিয়ে মঞ্চে নেমে পড়তাম। দর্শক ছিল আমাদেরই সমবয়সীরা। বাড়ির দু’চারজন বড়রাও কখনো কখনো শরিক হতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়েও নাটক করেছি।’

স্কুল ফাইনাল দেবার পর যে অখণ্ড অবসর সেই সময় তিনি বাড়ির অনুজদের নিয়ে অভিনয় করেন ‘কাজীর বিচার’, ‘ফলভোগী’, ‘রক্তমাখা স্বাধীনতা’ শ্রেণিতে পাঠ্য নাটকে।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

কথা হচ্ছিল উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী নিয়ে। ১৯৮৭ সালে সারোয়ার মুর্শেদ রতনের নাট্যরূপ দেয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ মঞ্চায়নের সময় গল্প উপযোগী স্লাইড শো প্রদর্শন করেন আলোকচিত্রী নীতিশ রায়।

এ ছাড়া চিত্রী নীতিশ রায় ‘১৯৯৪ সালে আবারো ‘দুই বিঘা জমি’ ও ‘লিচু চোর কবিতা দুটো অবলম্বনে নাট্যায়নের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটির জাতীয় গ্যালারিতেও এই স্লাইড শো প্রদর্শন করেন।’

টাউন শেরপুরে নাট্যচর্চার পূর্বাপর ইতিবৃত্ত থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে নাচ্যচর্চা খুব একটা বেগবান হয়নি। স্বাধীনতার প্রথম দশক ও পরবর্তী দশক জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত। পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন সংগঠন—হোক সে ক্রীড়া নাট্য বা সাংস্কৃতিক বা সাহিত্য পরিষদ অথবা শিশু সংগঠনের—জন্ম ও নানামুখী তৎপরতা লক্ষণীয়।

শ্রীবর্দী ঝিনাইগাতি নালিতাবাড়ি নকলা-সহ টাউন শেরপুরে তখন বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন সাংবার্ষিক কর্মতৎপরতা চালিয়ে গেছে নয়ের দশক পর্যন্ত। এমন কী কোনো কোনো গ্রামে নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছিল।

বিশেষ করে শীতকালীন সময়ে। শ্রীবর্দীর কুড়ুয়া ভায়াডাঙা, বিষ্ণপুর জগৎপুর, নন্দীবাজার নালিতাবাড়ির আড়াই আনী বাজার, মরিচপুরান, তারাগঞ্জ বাজার ইত্যাদি। নালিতাবাড়িতে গত শতাব্দীর তিনের দশক থেকে সংগঠনভিত্তিক নাট্যচর্চা ছিল। ছিল স্থায়ী মঞ্চ। সেই মঞ্চ ছিল ঘূর্ণায়মান।

‘গত শতকের তিনের দশকে শেষে নালিতাবাড়িতে গঠিত ‘তারাগঞ্জ আর্য নাট্য সমাজ’ প্রতিমাসে দু’টি করে নাটক মঞ্চস্থ করত। এ গোষ্ঠীর স্থায়ী মঞ্চ ছিল। এত বড় মঞ্চ এবং আনুষাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর ছাড়া এ এলাকার আর কোথাও ছিল না।’৩৩

মোস্তাফা কামাল লিখেছেন, ‘এদেরই ছিল ঘূর্ণামান মঞ্চ।… এই অখ্যাত বিজলী বাতিবিহীন জনপদেও দর্শনীর বিনিময়েই নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে।’৩৩

টাউন শেরপুরে যেমন নয়ানী বাড়ির জমিদারদের নাট্যপ্রীতি সকলেই অবহিত, এ ছাড়া বয়ড়া শেরিপাড়া প্রভৃতি স্থানে নাটক মঞ্চায়ন হতো। মোহিনী মোহন বল সেই যুগে একজন দক্ষ নাট্য পরিচালক ছিলেন। ছিলেন বিমল কর্মকার জাকির হোসেন হয়ে সুজয় মালাকারদের শহীদ মোস্তফা থিয়েটার ও ১৯৯৬ সালে গঠিত সমকাল নাট্যাঙ্গন।। নয়ের দশকে এই দুটি থিয়েটার নাট্যচর্চা ও মঞ্চায়নে টাউন শেরপুরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

নতুন শতাব্দীর শুরুতে সমকাল নাট্যাঙ্গন আয়োজন করে ‘নাট্য উৎসব ২০০০’। এতে মোস্তফা থিয়েটার (১৯৯০) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়েরর নাটক ‘ভাড়াটে চাই’ সঞ্জিব জয় শোয়ালের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়। মোস্তাফা থিয়েটার ২৯টি প্রযোজনার মোট ১০৭টি প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়েছে।

প্রতিভা থিয়েটার (১৯৮৮) মঞ্চস্থ করে মালিক ফখরুদ্দিনের নির্দেশনায় আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘এখোনো ক্রীতদাস।’ প্রতিভা থিয়েটারের তহবিলে সঞ্চয় আছে ১৪টি নাটকের ৪৮টি প্রদর্শনী।

নির্দেশক মালিক ফখরুদ্দিন সম্পর্কে শিব শংকর বলেন, ‘মালিক ফখরুদ্দিন অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন। কী দুর্দান্ত তার অভিনয়। ভরাট কণ্ঠের অধিকারী ফখরুদ্দিন একেবারে নাটক পাগল লোক ছিলেন। সারাজীবন দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করেছেন। শাহজাহান হোটেলের ম্যানেজার ছিলেন। দিনের বেলায় ম্যানেজারী করতেন। রাতে করতেন নাটকের রিহার্সেল।

ফখরুদ্দিন জীবনে ক্লিক করতে পারেননি। জীবনের খ্যাতি পরিচিতি প্রাচুর্যের সন্ধান তিনি পাননি। সবাই হয়তো পায়ও না। যদি পেতেন তাহলে আমি নিশ্চিত ফখরুদ্দিন দিয়েই আমরা পরিচিত হতাম। সারাজীবন মফস্বল শেরপুরে থেকে গেলেন বলেই বোধহয় ভাগ্যের শিকা তাঁর ছিঁড়লো না।’

জামালপুর থিয়েটার (১৯৯৪) ২২টি প্রয়োজনার ৫০টি শো মঞ্চের পাদপ্রদীপে আলোকিত। শাহীন রহমানের নাট্যরূপে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের ‘সূর্বণ গোলক’ মঞ্চস্থ হয় আলোক কুমার রায়ের পরিচালনায়।

সমকাল নাট্যাঙ্গনের প্রযত্নে চারদিনব্যাপী এই উৎসবে আয়োজক সংগঠন বিপুল দাম হৃদয়ের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ করে ‘রসে ভরা বঙ্গ দেশ’। সমকাল নাট্যাঙ্গন এই পর্যন্ত ৭টি প্রযোজনার ১৮টি প্রদর্শন করেছে। অধিকাংশ নাটকের পরিচালক ছিলেন সংগঠনের সভাপতি বিপুল দাম হৃদয়।

অন্য দুটির একটি পরিচালনা করেন শিব শংকর কারুয়া, আরেকটি দেব জ্যোতিসেন শর্মা। দেবজ্যোতি একজন দক্ষ নাট্যকর্মী। নয়ের দশকে লোকনাট্য দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। লোকনাট্য দলের প্রযোজনা ‘কুঞ্জুস’ নাটকের প্রধান চরিত্রে তিনি অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

টাউন শেরপুরে নাটকের কাগজ একটিই। নাট্যকর্মীদের নিজস্ব কাগজ থাকা জরুরি। সালাউদ্দিন মাহমুদের প্রচ্ছদে ‘নাট্যপত্র’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। শহীদ মোস্তফা থিয়েটারের মুখপত্র। সস্পাদক সুজয় মালাকার। ১৯৯০ সালের ৪ নভেম্বর নবীনগরে থিয়েটারের জন্ম হয়। নাটক বিষয়ক এটিই শেরপুরের প্রথম পত্রিকা।

যদিও টাউন শেরপুরে নাট্যচর্চার ইতিহাস দীর্ঘদিনের, নাটকের কাগজ বের করার কেউ উদ্যোগ নেয়নি। শহীদ মোস্তফা থিয়েটারের মুখপত্র বেশিদিন টিকেনি।

‘নাট্যপত্র’ বিষয়সূচি ছিল : ‘শেরপুরের গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত’ রবী নিয়োগী,’ ও ধীরেন হোড়ের ‘আমাদের আমলে নাট্যচর্চা’ ও বিমল কর্মকারের ‘নাট্যঙ্গনে আমি’।

শত বছরের টাউন শেরপুরের নাট্যচর্চার হদিশ যোগ্য কেউ একজন করবে, যতটুকু তথ্য-উপাত্ত পেলাম বিভিন্ন সুত্র তা টুকে রাখছি। ‘মূলত শেরপুরে নাট্যচর্চা শুরু হয় ১৯০০ সালের প্রথম দশকে। চন্দ্রকান্ত তর্কালংকার লিখিত একটি সংস্কৃত নাটকই সম্ভবত শেরপুরে প্রথম নাটক।’

মলয় মোহন বল লিখেছেন, ‘বীনাপাণি নামের একটি নাট্য সংগঠন প্রথম দিকে কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করলেও, বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। সুহৃদ নাট্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবার পরই দীর্ঘদিন নাট্যচর্চা জারি রেখেছে।৩৪

দেশভাগ পূর্ব টাউন শেরপুরে নাট্যচর্চা স্থানিক জমিদারদের সাহায্য সহযোগিতায় গতিশীলতা পায়। এই সময়েই গঠিত হয় ‘এ্যামেচার পার্টি’। মোহিনী মোহন বল টাউন শেরপুরে নাট্যচর্চার সিংহপুরুষ। নয় আনী বাড়ি জমিদারের আঙ্গিনায় তাঁর নির্দেশিত নাটক মঞ্চায়িত হয়।

বিমল কর্মকারের সৃজনী নাট্যগোষ্ঠী, জিকে স্কুলের ছাত্রবান্ধব নাট্য সংগঠন কমলা নাট্য সমাজ ফ্রেন্ডস স্টাফ ইত্যাদি সংগঠন নাট্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।

দেশভাগ উত্তর ষাটের দশকের শেষে গণ সংস্কৃতি সংসদ ও স্বাধীনতা উত্তর কৃষ্টি প্রবাহ, ত্রিসপ্তক, সন্ধানী শিল্পী গোষ্ঠী, শেরপুর নাট্য গোষ্ঠী, রাজহংস প্রোডাকশন হাউজ নাট্য চর্চায় টাউন শেরপুরকে রাখে উজ্জীবিত।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ৯ম পর্ব

এ টি এম জাকির হোসেনের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় বিষের পেয়ালা, জীবন যন্ত্রণা ও নিয়তির খেলা। জাকির হোসেন নাটক পরিচালনা করা ছাড়াও লিখেছেন নাটক। গড়েছেন কবিতার সংগঠন। সম্পাদনা করেছেন একাধিক ছোটকাগজ এবং তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহিক চলতি খবর নয়ের দশকে তরুণ কবিদের ছিল কবিতাচর্চার চাতাল।

জাকির হোসেনের সমসাময়িক আরেক নাট্যজন বিজন চক্রবর্তী (১৯৪৬)। বাকরাসায় ১৯৬০ সালে গঠন করেন ‘সৃষ্টি সাংস্কৃতিক সংসদ। স্বাধীনতা পূর্ব টাউনে হলে বিজন চক্রবর্তীর নির্দেশনায় মঞ্চায়িত হয় ‘আমিই ময়না’ (১৯৬২), ‘মুক্তি ডাক’ (১৯৬৯) ও ‘মুক্তি’ (১৯৭০)।

এই তিনটি নাটকই তাঁর নিজের রচনা। বাকরাসা গ্রাম দেশভাগ পূর্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে খুবই সমৃদ্ধ ছিল। এই গ্রামেই বসত করতেন প্রখ্যাত পণ্ডিত চন্দ্রকান্ত তর্কালংকার। এখানেই ছিল তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি ‘চতুষ্পাঠী’।৩৪

বিজন চক্রবর্তীর এই গাঁয়েরই সন্তান। স্বাধীনতার পর চলচ্চিত্রে সংযুক্ত হন। পরিচালক মীর হুমায়ন কবির ও রেজা হাসমতের সাথে কাজ করেন। কিন্তু নানা কারণেই টিকে থাকতে পারেননি, ফিরে আসেন শেরপুরে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পরেই বিজন চক্রবর্তী ‘রক্ত আগুন ধোঁয়া’ নামে একটি চিত্রনাট্য লিখলেও, সেলুলয়েডে বন্দী করতে পারেননি। আর্থিক অক্ষমতা ও সাংগঠনিকতার অভাবে এই চিত্রনাট্য ট্রাঙ্কবন্দী। কাদের হেসেন মাকসুদ, নোমান, বাদশা, রাজামিয়া ছিল সৃষ্টি সাংস্কৃতিক সংসদের কর্মী—জানালেন বিজন চক্রবর্তী।

২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত রূপান্তর নাট্যগোষ্ঠী ২০১২ সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ করে ‘মন্ত্রী হবার স্বপ্ন’—মমিনুর রহমান মিল্লাতের রচনায় ও আবু রায়হান পাভেলের পরিচালনায়। এ ছাড়া স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে ভ্রাম্যমাণ পথনাটক ‘রক্তের দামে কেনা’ বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...