shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

ছোট ছেলে বড় ছেলে

Childish Stories

ছোট ছেলে বড় ছেলে

সিদ্ধার্থ সিংহ

দুই ভাই। কিন্তু ওদের দেখলে কেউ বলবে না, ওরা একই মায়ের সন্তান। কেউ কেউ তাই বলে, বড়টা পেয়েছে মামাবাড়ির ধরন। ওর মামারা যেমন, ও-ও তেমন।

ওরা যে রাজ্যে থাকে, সেই রাজ্যে পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, জাত-পাত মানা হয় না। তাই যে পাঠশালায় রাজার ছেলেরা পড়ে, পণ্ডিতদের ছেলেরা পড়ে, সেই পাঠশালাতেই কোতোয়ালদের ছেলেরা পড়ে, ডাকাতদের ছেলেরাও পড়ে। আবার এই দুই ভাইও পড়ে।

পাঠশালায় ঢুকতে-না-ঢুকতেই বড়টার বন্ধু হয়ে গেল কোতোয়ালের ছেলে, ডাকাতের ছেলে, ডোমের ছেলে এবং গুনিনের ছেলের সঙ্গে। আর ওর যে ভাই, সে ছিল একদম উল্টো। লোকে বলত, ও ওর বাবা-জেঠার ধারা পেয়েছে। ওর বাবা-কাকারা যেমন, ও-ও‌ তেমন।

পাঠশালায় ঢোকার কয়েক দিনের মধ্যেই ওর পরম বন্ধু হয়ে উঠল পণ্ডিতমশাইয়ের ছেলে, পুরোহিতের ছেলে, কবিরাজের ছেলে, এমনকী রাজার ছেলেও।

ভাই চাইতো, তার দাদা তার বন্ধুদের সঙ্গে মিশুক। আর দাদা চাইতো তার ভাই তার বন্ধুদের সঙ্গে মিশুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। অগত্যা পাঠশালায় দুটো দল হয়ে গেল। এক দল অন্য দলের সঙ্গে পারতপক্ষে মিশত না।‌ তাই বাড়িতেও দুই ভাইয়ের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে লাগল।

বড় ছেলে যখন দলবল নিয়ে বেরোত, সামনে যার বাগান পেত, কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করত না, ঢুকে পড়ত। গাছের ডালপালা তছনছ করত। ফলমূল যা পেত, সাবার করত। খেত যত, নষ্ট করত তার শতগুণ।

আবার যেতে যেতে রাস্তায় কারো মুরগিছানা দেখলে, ঝট করে তুলে পটাস করে মটকে দিত ঘাড়। পুকুরে স্নান করতে গেলে ওদের দেখে সবাই সরে যেত। ঘাট শুনশান হয়ে যেত মুহূর্তে। মাছগুলো ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত জলের তলায়। পাখিরাও ওদের আশপাশের কোনো গাছে বসত‌ না। বসলেই ওরা গুলতি ছুড়ে মেরে দিত। এটা ছিল ওদের কাছে একটা খেলা।

আর ছোট ছেলে হেঁটে গেলে তাকে দেখার জন্য দু’পাশের কচি কচি ঘাস মাথা তুলে উঁকিঝুঁকি মারত। আহত সাপ তার উপস্থিতি টের পেলেই পায়ের কাছে এসে ঘুরঘুর করত। খানাখন্দ পথ নিজেদের মসৃণ করে নিত। উন্মাদ ঝড় তাকে দেখে পথ‌ বদলে ফেলত। ঝকঝক করত আকাশ।

ওদের মা ওদের খুব ভালোবাসতেন। ওদের বাবাও। সেই বাবা-মা একদিন দেখলেন, তাঁদের বড় ছেলে দেখতে দেখতে কেমন বীভৎস হয়ে গেছে। কী বিশাল চেহারা। মাথায় মারাত্মক দুটো শিং। চোখ দুটো আগুনের গোলা। পা তো নয়, যেন দুটো খাম্বা। জোরে পা ফেললে যেন মাটি‌ দেবে যাবে। পৃথিবী কেঁপে উঠবে ভেতরে ভেতরে। তাকালেই মনে হয়, একরাশ অন্ধকার বুঝি ওকে ঘিরে আছে।

আর ছোট ছেলে দিনকে দিন সুন্দর থেকে যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠছে। কী সৌম্য চেহারা! চোখের দিকে তাকালেই সমাহিত হয়ে যেতে হয়। ও একবার ছুঁলেই যেন সব রোগভোগ, দুঃখ-কষ্ট লাঘব হয়ে যাবে। যে রাস্তা দিয়ে ও হেঁটে যায়, তার আশপাশের গাছে টপাটপ ফুটে ওঠে ফুল। ওর কাছাকাছি গেলেই এক অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ মনকে কেমন যেন পবিত্র পবিত্র করে দেয়।

কেউ কেউ বলে, আপনার ছোট ছেলের মন তো খুব সুন্দর, তাই ও অমন সুন্দর হয়ে উঠেছে। আর যাদের মন জটিল, সবসময় খারাপ ফন্দি আঁটছে, কুচুটে, তারা তাদের মনের মতোই জটিল আর কুৎসিত হয়ে যায়। তাই আপনার বড় ছেলে অমন ভয়ঙ্কর দেখতে।

বাবা-মা ছোট ছেলের জন্য যতটা খুশি, ঠিক ততটাই চিন্তিত তাঁদের বড় ছেলের জন্য। তার কী হবে, কী অশুভ সংকেত যে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে—সেই ভয়ে তাঁরা সবসময় গুটিয়ে থাকেন। আর এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই একদিন ওদের বাবা-মা বিছানায় পড়লেন।

ছোট ছেলে কবিরাজ-বৈদ্য নিয়ে আসে, তো বড় ছেলে নিয়ে আসে গুনিন-ওঝা। ছোট ছেলে স্নান করিয়ে দেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তো বড় ছেলে তড়পায়; নিশ্চয়ই কেউ কিছু করেছে, একবার জানতে পারলে হয়, বংশে বাতি দেওয়ার কেউ থাকবে না। ছোট ছেলে জড়িবুটি এনে খাওয়ায়, তো বড় ছেলে মন্ত্রপূত জবা ফুল নিয়ে এসে খাটের পায়ার তলায় চাপা দেয়। এইভাবে সপ্তাহ গেল। মাসও গড়িয়ে গেল। বাবা-মা একটু সুস্থ হলেন বটে, কিন্তু পুরোপুরি রোগ মুক্ত হলেন না।

অবশেষে বড় ছেলে গেল তন্ত্র সমাজের গুরু অবিনাশ তান্ত্রিকের কাছে। যে ভাবেই হোক, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার বাবা-মাকে সুস্থ করে দিতে হবে। তার জন্য যা লাগবে, সে দিতে রাজি। পঞ্চমুণ্ডি আসনে বসে, অনেকক্ষণ সাধনা করে সেই তান্ত্রিক জানালেন, ধোপানি পাড়ার পেছনে উত্তুঙ্গ পর্বতের পাদদেশে বেশ কয়েকটি জাম্বুরা গাছ আছে। সেই গাছ থেকে জাম্বুরা পেড়ে এনে পর পর ন’দিন সকালে খালি পেটে যদি তার বাবা-মাকে খাওয়ানো যায়, তা হলে তাঁরা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন।

তবে একটা শর্ত, ওই জাম্বুরা যাঁদের খাওয়ানো হবে, তাঁদের যে ক’জন সন্তান আছে, তাদের সবাইকে কিন্তু একসঙ্গে ওই জাম্মুরা আনতে যেতে হবে। নচেৎ ওই ফলে কোনো কাজ হবে না।

যাঁদের খাওয়ানো হবে, তাঁদের সব সন্তানকেই একসঙ্গে যেতে হবে! সন্তান বলতে তো তারা দু’জন। তবে কি তাদের দু’জনকেই একসঙ্গে যেতে হবে?

কিন্তু তার ভাই তো তার উল্টো পথে হাঁটে। সে কি তার সঙ্গে যেতে রাজি হবে? হবে নাই-বা কেন? যাঁদের জন্য যাওয়া, তাঁরা তো শুধু তার একার বাবা-মা নন, ওরও বাবা-মা। তবে? না যেতে চাইলে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে সে। বাবা-মা বলে কথা!

বড় ছেলে এসে ছোট ভাইকে বলল, অবিনাশ তান্ত্রিকের কথা। তাঁর বলে দেওয়া টোটকার কথা। ওটা খাওয়ালেই নাকি তাদের বাবা-মা একেবারে সুস্থ হয়ে যাবেন। ছোট ছেলে সব কথা শুনল। শুনে বলল, ঠিক আছে।

কিন্তু ছোট ছেলের একটু খটকা লাগল। এত ডাক্তার-বদ্যি করলাম, কিচ্ছু হলো না। অথচ দাদা বলছে, জাম্বুরা খাওয়ালেই তার বাবা-মা ঠিক হয়ে যাবেন! ঠিক আছে, একবার রাজবৈদ্যকে জিজ্ঞেস করে দেখি। তিনি কী বলেন।

রাজার ছেলে ওর পাঠশালার সহপাঠী। হরিহর আত্মা। ও গেল তার কাছে। তার কাছ থেকে চিঠি নিয়ে সে দেখা করল রাজবৈদ্যর সঙ্গে। রাজবৈদ্য সব শুনলেন। তার পর বললেন, শোনো, তোমার বাবা-মায়ের যা উপসর্গ, তাতে কিন্তু বড় ডুমুর, মনে রাখবে, বড় ডুমুর মানে কিন্তু যজ্ঞডুমুর নয়, তার থেকেও বড় এক ধরনের ডুমুর হয়, সেই ডুমুর যদি পর পর ন’দিন প্রত্যুষে খালি পেটে তাঁদের খাওয়াতে পারো, তবে এই রোগ চিরজীবনের জন্য নির্মূল হয়ে যাবে।

সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, কত বড় ডুমুর?

রাজবৈদ্য বললেন, পেয়ারার মতো বড় বড়।

—কোথায় পাব?

—ধোপানি পাড়া চেনো? শুনেছি, ধোপানি পাড়ার পেছনে উত্তুঙ্গ পাহাড়ের নিচে নাকি বেশ কয়েকটা ওই গাছ আছে।

—কিন্তু চিনব কেমন করে?

রাজবৈদ্য বললেন, ওখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করবে, যে কেউ দেখিয়ে দেবে। বলবে, জাম্বুরা গাছ কোনটা?

—জাম্বুরা গাছ?

—হ্যাঁ, ওখানকার লোকেরা ওই ডুমুরকে জাম্বুরা বলে।

চমকে উঠল সে। এই গাছের কথাই তো তার দাদা তাকে বলেছিল। তবে কি… পথ যতই আলাদা হোক, বিধান এক!

পর দিন রাত থাকতে উঠে দু’ভাই হাঁটা দিলো উত্তুঙ্গ‌ পাহাড়ের দিকে। সূর্য ওঠার আগেই ওই ফল তাদের পাড়তে হবে। কাছাকাছি গিয়ে দেখল, কতকগুলো লোক কাঠ কাটতে যাচ্ছে। তাদের কাছে বলতেই তারা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল জাম্বুরা গাছ।

দু’ভাই দূর থেকে দেখল, দু’আড়াই মানুষ সমান লম্বা গাছগুলো সামান্য বাতাসেই একবার এ-দিকে ঝুঁকে পড়ছে, একবার ও-দিকে। ওরা তো অবাক। এত পলকা গাছ! ওরা আরো দেখল, সব ক’টা গাছেই থোকা থোকা ফল। এত বড় বড় ফল যে, এত দূর থেকেও সেগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই ফলই ওদের লাগবে। মাত্র আঠেরোটা।

মায়ের জন্য একটা আর বাবার জন্য একটা, মানে প্রতিদিন দুটো করে ন’দিনে মোট আঠেরোটা। এই আঠেরোটা ফল পেলেই তাদের বাবা-মা সুস্থ হয়ে যাবেন। তাঁদের মুখে হাসি ফুটবে। আর সেটা দেখে তাদের দু’ভাইয়েরও চোখ-মুখ চকচক করে উঠবে। ওরা কাছে এগিয়ে গেল।

বাতাসের ধাক্কায় এ বার ঝুঁকে পড়লেই গাছটাকে ও ধরবে। যেই বড় ছেলে এটা ভেবেছে, অমনি গাছগুলো টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল, আরো জোরে বাতাস কখন আসবে, তার জন্য।

তাদের আকাঙ্ক্ষার চেয়েও আরো আরো জোরে বাতাস এক সময় এলো বটে, কিন্তু নুইয়ে পড়া তো দুরের কথা, সে বাতাসে একটা পাতাও নড়ল না। ছোট ছেলে মগডালের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। আর বড় ছেলে ওই গাছের কাণ্ড ধরে ঝাঁকাতে লাগল। দেখল, সামান্য হাওয়াতেই যে গাছটা মাটির সঙ্গে প্রায় লুটোপুটি খাচ্ছিল, সেই গাছটা তার মতো বলশালীর প্রচণ্ড ঝাঁকানিতেও এতটুকু কাঁপল না।

সে ঠিক করল গাছে উঠবে। এ রকম কত গাছে‌‌ যে সে তরতর করে উঠেছে! যেই উঠতে গেল, দেখল, তার হাত-পা সব পিছলে যাচ্ছে। গাছটার সারা গায়ে যেন স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা। অথচ নিচে নেমে গাছটাকে ভালো করে দেখতে গিয়েই, সে অবাক। কোথায় শ্যাওলা! কোথায় পেছল! এ তো একেবারে খটখটে শুকনো।

এই গাছটায় বোধহয় কোনো গণ্ডগোল আছে, দেখি তো ওই গাছটা। বড় ছেলে চলে গেল ও দিকটায়। যেই ও চলে গেল, অমনি গাছটা আবার বাতাসে দুলতে লাগল। দুলতে দুলতে একদম ঝুঁকে ছোট ছেলের কানে কানে বলে গেল, ওটা কে গো, তোমার সঙ্গে এসেছে? কী বীভৎস দেখতে! ও থাকলে আমাদের ফলগুলো মগডালে উঠে যাবে। পাড়তে গেলে ডালগুলো আরো উঁচুতে উঠে যাবে। ওকে যেতে বলো।

এদিকে বড় ছেলে পাশের গাছটাতে গিয়ে যখন দেখল, ওই গাছটাও এই গাছটার মতোই অনড় আর পিচ্ছিল, তখন ঠিক করল, এক হ্যাঁচকায় গাছটাকে উপড়ে ফেলবে। অনেকবার চেষ্টাও করল। কিন্তু কোনো লাভ হল না।

অবশেষে ও যখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না, ঠিক তখনই গাছটা তাকে বলল, গায়ের জোরে কিচ্ছু পাওয়া যায় না গো। ভালোবাসলে সব পাওয়া যায়, সব। ভালোবাসতে শেখো। ভালোবাসলে এই ফল পাড়ার জন্য তোমাকে আর কসরত করতে হবে না। এই ফল-ধরা ডাল নিজে থেকেই তোমার কাছে ঝুঁকে আসবে।

—ভালোবাসব! কিন্তু কী করে ভালোবাসতে হয়, তা তো আমি জানি না।

তুমি যেভাবে মাকে ভালোবাসো কিংবা বাবাকে ভালোবাসো—সেভাবে ভাইকে ভালোবাসো, আকাশকে ভালোবাসো, পাখিকে ভালোবাসে, মাটিকে ভালোবাসো, দেখবে তুমিও তোমার ভাইয়ের মতো একদিন সুন্দর হয়ে উঠবে। কেউ আর তোমাকে দেখে ভয়ে দূরে সরে যাবে না।

—কিন্তু কী করে ভালোবাসতে হয়, সেটা আমি শিখব কী করে?

—ভালোবাসা কখনো শেখা যায় না। শেখানোও যায় না। ওটা সম্পূর্ণ ভেতরের ব্যাপার। যেমন সাধুসঙ্গ করতে করতে দানবের কঠোর মনও একসময় পাল্টে যায়, আবার চোরের সঙ্গে থাকতে থাকতে দাতার আঙুলও যেমন সুযোগ পেলেই নিশপিশ করে ওঠে, তেমনি যারা ভালোবাসতে জানে, তুমি যদি তাদের সঙ্গে মেশো, তাদের সঙ্গ করো, দেখবে, তুমিও একদিন ভালোবাসতে শুরু করে দিয়েছ। সঙ্গগুণ এমনই। সঙ্গদোষে যেমন অনেক ভালো লোকও কুপথে চলে যায়, তেমনি সঙ্গগুণেই আবার বহু মানুষ ভালোও হয়ে যায়।

—তাই!

পেছন ফিরে দাদা হাঁটা দিয়েছে দেখে ভাইও তার পিছু নিলো। দু’জনে পাশাপাশি যেতে যেতে কখন যে ওরা এ-ওর হাত ধরেছিল দু’জনের কেউই খেয়াল করেনি। এমন সময় ভাই দেখল, রাজার ছেলে, পণ্ডিতের ছেলে, কবিরাজের ছেলে, পুরোহিতের ছেলেরা হন্তদন্ত হয়ে তাদের দিকেই আসছে। ওরা সবাই তার পাঠশালার বন্ধু। কাছে আসতেই ও বুঝল, তারা যে মা-বাবার ওষুধের জন্য এখানে এসেছে, সেই খবর পেয়েই ওরাও এখানে এসেছে।

ওরা যা বলল, তাতে বোঝা গেল, ওরা মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছে। তাদের বাবা-মা যে এত অসুস্থ, সেটা তারা ওদের জানায়নি দেখে। তার মানে তারা ওদের বন্ধু বলে মনে করে না। নিজের লোক মনে করে না। এটা নিয়ে ওদের ভীষণ অভিমানও হয়েছে। পাশাপাশি ওরা নিজেরাও বেশ‌ অনুতপ্ত। ‌দু’ভাই পর পর এ ক’দিন স্কুলে যায়নি দেখে ওদেরই আন্দাজ করা উচিত ছিল নিশ্চয়ই কোনো অঘটন ঘটেছে। ‌ওদেরই উচিত ছিল নিজে থেকে ওদের খোঁজখবর নেওয়া।

কোনো বন্ধুর বিপদে দাঁড়াতে না-পারার কষ্ট যে কোনো বন্ধুর এতটা হতে পারে, এই প্রথম যেন সে দেখল, এমন ভাবে একবার ভাইয়ের মুখের দিকে, আর একবার ওদের মুখের দিকে তাকাতে লাগল তার দাদা।

কথা বলতে বলতে ভাইয়ের বন্ধুরাও হাঁটা ধরল তাদের সঙ্গে। ফিরতে লাগল বাড়ির দিকে।

হঠাৎ ছোট ছেলে দেখল, রাস্তার ধারে থেকে নেমে যাওয়া ঢালু পথ বেয়ে আচমকা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে তার দাদা। কোথায় যাচ্ছে সে!

পেছন পেছন ও-ও নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ওর বন্ধুরাও। কাছে গিয়ে দেখল, এ গাছের সে গাছের ডালে কতকগুলো কাক ‘কা-কা’ করছে। আর তার দাদা একটা বিশাল বটগাছের বেরিয়ে থাকা শিকড়-বাকড়ের ফাঁকে হাত গলিয়ে একটা চড়াই পাখির ছানাকে আলতো করে তুলে নিয়ে আসছে। এত আলতো করে যেন কোনো মা তার সদ্যোজাতকে বুক দিয়ে আগলে নিয়ে আসছে। ভাইকে দেখে সে বলল, এখন ছাড়লেই কাকগুলো ঠুকরে ঠুকরে‌ একে মেরে ফেলবে। তার চে’ বরং চল, একে বাড়ি নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুলি। তার পর না-হয় উড়িয়ে দেবখ’ন।

এক দঙ্গল ছেলে রাস্তা দিয়ে ও ভাবে যাচ্ছে দেখে আশপাশের লোকেরা বারবার ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল ওদের। লোকগুলো ওই ভাবে কেন দেখছে তাদের? মনে হতেই ছোট ছেলে তাকাল বড় ছেলের দিকে।

দেখল, তার দাদার আগুনের গোলার মতো চোখ দুটো কেমন যেন মায়াময় হয়ে গেছে। মাথার সিং দুটো উধাও। চেহারাটার মধ্যেও কেমন যেন একটা প্রশান্ত প্রশান্ত ভাব।‌ মুখটাও কত কোমল‌ গেছে। দেখে দেখে এত সাবধানে পা ফেলছে, যাতে তার পায়ের নিচে পড়ে কোনো ঘাসও পিষে না যায়।‌ আর তার চারদিকে কী সুন্দর একটা গন্ধ।

ছোট ছেলে বলল, দাদা, যাবি? চল না, আর একবার চেষ্টা করে দেখি। জাম্বুরা পাড়তে পারি কি না…

দাদা বলল, না, আজ থাক। মা-বাবা তো এতদিন কম কষ্ট করেননি, আরো একটা দিন নিশ্চয়ই সহ্য করতে পারবেন। তার আগে এই চড়াইছানাটাকে সুস্থ করে তুলি চল। দ্যাখ দ্যাখ, চড়াইছানাটা কী সুন্দর চুপটি করে বসে আছে। ওর বুক আগের মতো আর অত জোরে জোরে ধকধক করছে না।

Spread the love