shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়ের দুটি অণুগল্প

Debasis Mukherjee Short Story

দুটি অণুগল্প

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়ের দুটি অণুগল্প

পেখম

অফিস ফেরত বাড়ি ঢুকতেই বউয়ের চিৎকার কানে এলো। মেয়ে পেখমকে বকাবকি চলছে। আমাকে দেখেই আরো জোর বাড়লো গলায়। মেয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে মারের ভয়ে। রেগে গেলে মা শ্রীমতী ভয়ঙ্করী, পেখম তা জানে। গর্জে উঠলো বউ ‘আজ আবার স্কুলে টিফিন বক্স হারিয়েছে। এই নিয়ে পর পর তিনদিন।’

যে মেয়ে এতোদিন স্কুলে একটা ছোট পেন্সিল পর্যন্ত হারায়নি, সেই মেয়ে টিফিন বক্স হারাচ্ছে রোজ। মনে খটকা লাগলো। এগিয়ে গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে গেলাম। বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠলো। কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর শরীর।

পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম বিষয়টা। বাবার স্পর্শ ওকে সান্ত্বনা দিলো বোধহয়। কান্না থামিয়ে যা বললো, তা শুনে চমকে উঠলাম।

ওরা টিফিনের সময় ক’জন বন্ধু মিলে জানালার ধারে বসে টিফিন খায়। হঠাৎ সেদিন দেখলো একটা ছেলে ক্ষিধের জ্বালায় ওর মায়ের কাছে খাবার চাইছে। ঘরে খেতে দেওয়ার কিছু নেই বলে ওর মা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। মনটা খারাপ হয়ে গেল পেখমের।

স্কুলের পাঁচিলের ধারের ঝাউ গাছটার একটা ডাল বাইরে ওদের ঘরের কাছে গেছে। ও টিফিন ভর্তি বাক্সটা গাছের ঐ ডালটায় ছুঁড়ে দিতে বাক্সটা গড়িয়ে ওদের কাছে গিয়ে পড়ল। খাবার দেখে ছেলেটা লাফিয়ে উঠলো। ওপরে চাইতেই ওকে দেখতে পেল। এক মুখ হাসি বাচ্চাটার।

এর পরের দু’দিনও পেখম ঐভাবেই খাবার দিয়েছে ছেলেটাকে। ছেলেটা টিফিনের সময় দাঁড়িয়ে থাকে ওর জন্য। খাবার পেয়ে ওর হাসি পেখমের খুব ভালো লাগে। ক্ষিদের কান্না থাকে না তখন।

বন্ধুদের কাছ থেকে বিস্কুট চেয়ে খেয়েছে এ ক’দিন। ছেলেটার কথা ভেবে ওর ক্ষিধেই পায়নি।

বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ছোট্ট পেখম ডানা মেলতে শিখছে তাহলে। অপরের দুঃখে ও কষ্ট পাচ্ছে ভেবে মনে ভরসা পেলাম। সৌমনস্যতার পরিবেশে মেয়ে বড় হচ্ছে।

বউ চা নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনেছে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ও কেঁদে উঠলো। এক অপার্থিব আনন্দধারায় যেন ভিজতে লাগলাম তিনজনে।

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়ের দুটি অণুগল্প

বিজিগীষা

বৃষ্টি স্মৃতির বৃত্ত রচনা করে চলেছে। বৃষ্টি এলেই আসে সেই কাদামাঠে ফুটবল, ভিজে চুপচুপ সাইকেলে ঝড় তোলা, জলে ডুবে বৃষ্টির পিয়ানোর টুং টাং। তখন তারা খুব আপন বিহানের।

তাপসীকে খিচুড়ি-ডিমভাজা রাঁধতে বলে চায়ের কাপ নিয়ে ব্যালকনিতে এসে বসল ও। মাধবীলতা জল ছিটিয়ে যেন স্বাগত জানালো। বৃষ্টির রেণু সারা গায়ে এখন ওর। চশমার ঝাপসা কাঁচে ও যেন ভেতরের আমিতে।

এখন বিহান বাড়িতে একাই থাকে। একমাত্র মেয়ে তিতলি আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি পড়ায়। ওর মা কিছুদিন হলো গেছে মেয়ের কাছে। তিতলির শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কিছুদিন। বড় অনিয়মের জীবন ওর। খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করে না। চটজলদি খাবার খেয়ে কাজ চালায়। রাতে অনেক দেরি করে শোয়। বললেই বলবে, পড়তে পড়তে দেরি হয়ে যায়। প্রচুর বই পড়ে।

ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে গড়ে ওঠা অভ্যাস এখন আরো ডালপালা মেলেছে। ওর মা তাই থাকবে কিছুদিন মেয়ের কাছে।

বিহানের এদিকে অসুবিধা কিছু নেই। তাপসী রান্না দু’বেলা করে দিয়ে যায়। রান্নার হাত বেশ ভালো মেয়েটার। গত বছর ওর বর মারা যায়। রিকশা চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে একটা লরি পিষে দিয়ে যায়। অনেকে বলে লরি ড্রাইভারের সাথে তাপসীর পরকীয়ার পরিণতি এই মৃত্যু।

তবে এ বাড়িতে মেয়েটার চালচলনে খারাপ কিছু পায় না বিহান। একদম মাপা আচরণ ওর। প্রথমদিন থেকে এটাই বলে দিয়েছে।

ব্যালকনিতে বৃষ্টি তার সাদা আবীর ছড়িয়ে চলেছে। এ পরিবেশে মনে গুনগুন করে উঠলো ওর প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত। উঠে গিয়ে সাউন্ড সিস্টেমে জর্জ বিশ্বাসের গান চালিয়ে দিয়ে বসলো চেয়ারে।

রাস্তায় লোকজন ছত্রপতি। এলোমেলো হাওয়ার আলিঙ্গনে তারা। ছাতা নিয়ে টলোমলো সাইকেল যাত্রীরা। একজনের ছাতা তো উড়ে গিয়ে পড়ল পাশের ড্রেনে। বিহান মুচকি হেসে ফেললো। অসহায় ভেজা মানুষটা আবার ছাতার আশ্রয়ে।

হঠাৎ বাঁশির আওয়াজে চোখ ফেরালো সামনের সুইমিং পুলটায়। একটা মেয়ে বৃষ্টির মাঝেও ব্যাকস্ট্রোকে এগিয়ে চলেছে জল চিরে। অন্য বাচ্চারা উঠে পড়ে ফেরার তোড়জোড়ে। একা একা মেয়েটা নিজেকে তৈরি করে চলেছে।

দূরে ছাওয়ায় দাঁড়িয়ে ওর কোচ বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার মুখটা জলের ওপর দেখা যাচ্ছে। সারামুখ যেন আগুনমাখা। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দু’চোখে স্বপ্ন দেখার সাহস।

বৃষ্টির জলে স্মৃতির ফসফরাস জ্বলে। আস্তে আস্তে মেয়েটার মুখটা বদলে যেতে লাগলো ছেলেবেলার বিহানে। মানুদার কোচিংয়ে ওর তখন সকাল-সন্ধ্যে ফুটবল প্র্যাকটিস। স্ট্রাইকারে খেলতো ও। পায়ে ড্রিবলিং ছিল ভালো। চোরা গতি ছিল ওর পায়ে। বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে  ওটা ও কাজে লাগাতো। বল যেন ওর কথা শুনতো। মাথাটা ছিল ওর ঠাণ্ডা। হেডিংও ভালো।

অন্যরা প্রাকটিস ছেড়ে চলে গেলেও, শটে জোর আনার জন্য ও প্রতিদিন পঞ্চাশটা করে শট নিতো গোলে। মানুদা তখন গোলকিপার। ভুল ত্রুটি হাতেকলমে দেখিয়ে দিতো। সঙ্গে চলতো বাঁক খায়ানো কর্নার কিক। মানুদা স্পেশালিস্ট ছিল ঐ কিকে।

কাদার তালকে একসময় দৃষ্টিনন্দন মূর্তি বানিয়েছিল মানুদা। রাজ্য দল, জাতীয় দল, কলকাতার নামী ক্লাবে সুনামের সাথে খেলেছে দশ বছর। রেলে খেলোয়াড় কোটায় চাকরিও পেয়েছে। মানুদা যেন ঐ বাঁশিমুখ সাঁতার কোচ!

বৃষ্টির ছাটে আবার সম্বিত ফিরে পায় বিহান। দেখল মেয়েটা তোলপাড় করে চলেছে সুইমিং পুল—অক্লান্ত, বিরামহীন। কোচের চোখে মুখেও যেন গর্বিত অনুভব। বিহান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো, মেয়েটা যেন সফল হয় ওর অভীষ্ট লক্ষ্যে।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...