বুধবার, নভেম্বর ২৫সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

ধর্ম নিয়ে

1 0
Read Time:6 Minute, 33 Second
About religion

ধর্ম নিয়ে

সুনীল শর্মাচার্য

সেদিন এক বুদ্ধিজীবীকে বলতে শুনলাম, সব মানুষ নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা চিন্তাবিদ আখ্যা দেন, বা যাঁদের জাতপাত, ধর্মে বিশ্বাস নেই এক্কেবারেই, তাঁদের পিতৃত্ব নিয়ে বিশেষ রকম সন্দেহ থেকেই যায়! অর্থাৎ, তিনি তাঁদের স্পষ্টতই অবৈধ বলে দাগিয়ে দিলেন, আক্ষরিক অর্থে যদিও-বা না হয়, রূপকার্থে তো বটেই।

তবে কথা গলো, বুদ্ধিজীবীমশাই যা বলেছেন, তা আসলে ক্রমবর্ধমান এক ভাবনাপ্রবাহ—যেখানে অনায়াসেই নিজ জীবনের পছন্দ-অপছন্দকে নৈতিকতার মানদণ্ডে মাপা হচ্ছে। কে কোন ধর্মে বিশ্বাস করবেন, বা আদৌ কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হবেন কি না, সবই তো ব্যক্তিগত জীবনের পছন্দ-অপছন্দের বিষয়, তাই না?

মানে বলতে চাইছি, হতেই তো পারে আমি কোনো-এক বিশেষ ধর্মাবালম্বী পরিবারে জন্মালাম, কিন্তু তা বলে আমার কি ন্যূনতম সে অধিকার নেই, অন্তত এই স্বাধীন  সমাজে, যে আমি স্বেচ্ছায়—সে ধর্মকেই পাল্টা প্রশ্ন করতে পারি, তাকে প্রয়োজনে নস্যাৎ করে অন্য কোনো ধর্মকে আপন করতে পারি, বা তেমন হলে, সমস্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিতে পারি?

আমি নিজ পছন্দ অনুযায়ী যে কোনো-প্রকার বিশ্বাস বা বোধের সঙ্গে একাত্ম হতে পারি, বা নাও হতে পারি, কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন আমি নিজ বাছাইকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য কোনো অদৃশ্য দায়ে, অন্যের পছন্দকে হীন আখ্যা দিই।

শুধু অন্যের পছন্দকে হীন আখ্যা দেওয়াই নয়, এক রকম নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বও দাবি করি।

মানে ধরা যাক, বুদ্বিজীবীমশাইয়ের মতো এক আদ্যন্ত ধার্মিক মানুষ, অন্তত তাঁর কথা শুনে তো তেমনই বোধ হয়, যদি কোনো নিরীশ্বরবাদী বা অজ্ঞেয়বাদীকে হেয় প্রতিপন্ন করেন—নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই দিয়ে, তখন বলতে বাধ্য হচ্ছি, তা স্পষ্টতই অন্যের পছন্দকে, বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে খর্ব করার প্রবল চেষ্টা।

একই সঙ্গে বলব, নব্য-নিরীশ্বরবাদী কোনো মানুষ যখন ধর্ম মাত্রই তাকে ভুল প্রতিপন্ন করতে চান, ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতার  দোহাই  দিয়ে, তখন তাও সমান মাত্রায় অনুচিত।

আমার তো বিশ্বাস, সভ্য এই সমাজে মাত্র একটিই নৈতিক অবস্থান থাকতে পারে, থাকা উচিতও, যে কারো জীবনের স্বেচ্ছায় নেওয়া রাস্তা, কখনোই অন্যকে বিপদে ফেলতে পারে না।

মার্কাস অরেলিয়াসের কথা মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘লাইফ ইজ ফ্লাক্স, অল ইজ ওপিনিয়ান।’ আমি যা ইচ্ছে ভাবনাধারায় আস্থা রাখতে পারি, তা ধর্ম-সম্বন্ধীয় হোক, বা অন্য যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক, আমার ভাবধারায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না কেউ, যদি না আমার সে ভাবধারা, সেই বেছে নেওয়া পথ স্পষ্টতই  অন্য কোনো জনকে আঘাত করে।

সে যাই হোক, কখনোই উচিত হবে না, আমার বেছে নেওয়া পথ, আমার একান্ত আপন সিদ্ধান্তকে অন্যের সিদ্ধান্তের চেয়ে অধিক জরুরি মনে করে, তাতে একরকম নৈতিক শ্রেষ্ঠতা জ্ঞাপন করা।

কোনো বিষমকামী তাঁর যৌন পছন্দকে যদি সমকামীর তুলনায় অধিক শুদ্ধ মনে করেন এবং ভাবেন, সমকামীর পছন্দ নৈতিক মাপদণ্ডে ভুল, তবে তা ঠিক নয়।

অবশ্যই স্বেচ্ছায় কোনো অপরাধীর জীবনের সঙ্গে তাল মেলাতে চাইব না, কারণ অপরাধী অন্যের ক্ষতি করছে। অথচ কোনো নিরীশ্বরবাদী, কোনো মুক্তচিন্তক বা সংখ্যাগরিষ্ঠের থেকে আলাদা যৌনবিশ্বাসের কোনো মানুষের পছন্দকে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে হীন প্রতিপন্ন করা হয়, যদিও তা অন্য কারো ক্ষতি করছে না এবং অন্যরাও একইভাবে নিজেদের পছন্দ অনুসারে চলতেই পারেন।

জীবনে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে যখনই নৈতিকতাকে জুড়ে ফেলা হয়, তখনই সৃষ্টি হয় বিশ্বজুড়ে অসহিষ্ণুতার সমস্যা।

ফলে আমার বিশ্বাস, নীতিরই যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে তার একটিই মাপদণ্ড, তা অন্য কারোকে আঘাত করছে কি না, কল্পিত নয়, সত্যিই ক্ষতিকর কোনো পদক্ষেপ।

যদি আমি চাই কোনো সিনেমা বা বই বা খাদ্যাভ্যাস বা এমনকি কোনো-এক বিশেষ ভাবনার বিরুদ্ধে

নিষেধাজ্ঞা জারি করব, স্রেফ তা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা পছন্দের সঙ্গে খাপ খায় না বলে, তবে কি তা আদতে এক ধরনের হিংসাত্মক পদক্ষেপ নয়?

সেক্ষেত্রে তো নৈতিকতার ঢাল খাড়া করে আসলে অন্য-এক বিশ্বাসীকেই বিপাকে ফেলছি। অতএব নীতিকথা সেই একটিই—নিজ ইচ্ছায় চলুক এ জীবন, শুধু তা সর্বজনীন নীতি রূপে যেন পরিবেশিত না হয়।

…………………

পড়ুন

কবির ভাষা, কবিতার ভাষা : সুনীল শর্মাচার্য

সুনীল শর্মাচার্যের একগুচ্ছ কবিতা

সুনীল শর্মাচার্যের ক্ষুধাগুচ্ছ

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleppy
Sleppy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

৪ thoughts on “ধর্ম নিয়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *