shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

নিলেশ ও ছোট্ট ভূত, ১০, শেষ পর্ব

Little Ghost

শিশুতোষ উপন্যাস, ধারাবাহিক—পর্ব ১০ (শেষ)

নিলেশ ও ছোট্ট ভূত

আফরোজা অদিতি

স্কুল খুলেছে। নিলেশ স্কুলে যাচ্ছে। ডিংডং ছায়ার মতো আছেই। নিলেশ ওকে যতোই বুঝায়, কিছুতেই শোনে না ডিংডং। ওকে নিয়ে মহাফ্যাসাদ হচ্ছে মাঝেমধ্যে, ডিংডং-এর ঘ্যানঘ্যানিতে বিরক্ত হয়ে স্কুলে নিয়ে এসেছে ওকে। কিন্তু ক্লাসে ঘটালো বিপত্তি।

ডিংডং ক্লাসে গিয়ে ছেলেদের বইখাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে, এর খাতা ওর বই মিশিয়ে দেয়। কারো আবার টিফিন ফেলে দেয়। আর কলা থাকলে তো কথাই নেই, খেয়ে ফেলে! ছেলেরা প্রথমে কিছু বলেনি। কিন্তু চারদিনের দিন ছেলেরা ঠেসে ধরলো ওকে।

‘আমাদের বই ছড়ানো থাকে, একজনের বই-খাতার সঙ্গে অন্যজনের বই-খাতা মিলিয়ে রাখা থাকে, কিন্তু তোমার বই গোছানো থাকে কীভাবে? আমাদের টিফিন ফেলে-ছড়িয়ে দেয়া হয়, কলা থাকে না! তুমি ভাবো আমরা কিছু বুঝি না।’

নিলেশ যতো বলে এ-কাজ ও করতেই পারে না, শোনে না ওরা। ওরা নালিশ করেছে হেড স্যারের কাছে। হেড স্যার ওকে বলেছে, ‘এই প্রথমবার বলে কিছু বললাম না নিলেশ, কিন্তু এরপরের বার এরকম হলে শাস্তি দিবো তোমাকে। এমনিতেই তুমি ছয় মাস ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলে, তবুও তোমার মায়ের কথা ভেবে, আর তার কথা ফেলতে পারিনি বলেই তোমাকে ক্লাসে নিয়েছি। তোমার মা, খুব ভালো মানুষ।’

স্যারের কথা শুনে খুব দুঃখ পেয়েছে, অপমানিত বোধ করেছে, কিন্তু কিছু বলতে পারেনি নিলেশ। স্যারকে বলতে পারেনি—এই কাজ করেনি ও, করেছে ডং। এসব কথা তো বিশ্বাস করবে না কেউ।

ডিংডংকে বলেছে, ‘তুমি যদি এরকম করো তাহলে তুমি আর স্কুলে এসো না। বাড়িতে থাকবে, আর স্কুলে এলে বাধ্য হয়ে থাকবে। তোমার জন্য স্যার আমাকে বকেছে, ছি।’

নিলেশের কথায় মন খারাপ হয়ে গেল ডিংডং-এর।

কয়েকদিন ভালোই কাটলো। কিছুই বিপত্তি ঘটালো না ডং। কিন্তু সেদিন যা ঘটলো, আর এমন বিপত্তিই ঘটালো ডিংডং, যে বলার মতো নয়!

ওদের ক্লাস টিচার খুব রাগী। বেত হাতে নিয়ে ক্লাসে আসে। কথায় কথায় মারের ভয় দেখায়। বেত উঁচিয়ে টেবিলে আঘাত করে, আর ছাত্ররা শিউরে ওঠে ভয়ে, কাঠ হয়ে থাকে। এর আগে ঐ স্যারের ক্লাসে ডং ছিল না, তাই দেখেনি। স্যার ঢুকেছে। ছেলেরা সকলে দাঁড়িয়ে আদাব-সালাম দিয়েছে। ইংলিশ গ্রামার আজ। পড়া শুরু করেছেন স্যার। নিলেশ মনোযোগ দিয়ে পড়া শুনছে।

হঠাৎ স্যার চিৎকার করে উঠলো। স্যারের চিৎকারে সকলের সঙ্গে নিলেশও তাকিয়েছে। অবাক হয়েছে সকলে, কিন্তু অবাক হয়নি নিলেশ। ঠিক বুঝেছে এ হলো ডিংডং-এর কাজ, ও ছাড়া আর কে করবে এমন কাজ। সকলে ভয় পেয়েছে। টু শব্দট করছে না কেউ।

ডিংডংকে ডাকল নিলেশ, ফিসফিস করে বলল, ‘ঠিক করে দাও স্যারের হাত।’

‘না, কিছুতেই না। ঐ স্যার ভালো না, শুধু বেত্রঘাতের ভয় দেখায় কেন?’ ডিংডং বলে।

‘এমন করো না ডং, ভালো হবে না। স্যার আরো রেগে যাবেন, মারবেন।’

‘শুধু শুধু মারবে কেন? অন্য স্যারেরা কী কখনো বেত নিয়ে ক্লাসে আসে। ছাত্ররা এমনিতেই স্যারকে ভয় পায়, বেত দেখাতে হয় না।’ ডিংডং একরোখা। ওর একরোখামি দেখে রাগ হলো, বিরক্তও হলো।

বলল, ‘তুমি যদি এমন করো, তাহলে কী কোনো কাজ করতে পারবো আমি! এই স্কুলে কী থাকতে দিবে আমাকে! সবসময় তোমাকে সামাল দিতে হলে তো রাগ করবেন মা, রাগ করবেন বাবা। আর হেড স্যার তো বলেছেন, স্কুলে রাখবেন না আমাকে। স্কুলে যদি না-রাখেন স্যার, তাহলে কোথাও ভর্তি হতে পারবো না, বুঝো আমার ব্যাপারটা ডং।’

ওর কথাতে মুখ ভার করে থাকলো ডং। নিলেশ আরো বলল, ‘তুমি কষ্ট পেয়ো না ডং, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। কিন্তু তুমি তো জানো সবখানে সবকিছু করা যায় না, করা ঠিক নয়, উচিতও নয়।’ ডিংডং মুখ নিচু করে বসে রইলো।

চিৎকার করছে ছেলেরা। টিচার বাঁ হাতে কলিংবেল টিপে বেয়ারাকে ডেকে সব স্যারদের ডাকতে বলেছেন। সবাইকে ডাকার আগেই চলে এসেছেন টিচাররা। ক্লাসের পাশেই টিচার’স রুম। সকলে এসে দেখে স্যারের বেত শুদ্ধ হাত উঁচু হয়ে আছে।

নিলেশ ডিংডংকে বলেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু একরোখামি করে দেরি করেছো ডং। সব স্যারেরা দেখছে তা। এরপর ঠিক করে দিয়েছে ডিংডং, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

সব ছেলেরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। ওরা বলল, ‘এসব নিলেশ করেছে স্যার। ও ম্যাজিক জানে। ম্যাজিক দিয়ে এগুলো করেছে।’

স্যারদের চোখ নিলেশের দিকে। নিলেশের না কেউ শুনছে না, শুনলো না। নিলেশকে ডাকলেন হেড স্যার। ধমক দিয়ে বললেন, ‘এই কাজ কেন করেছ?’ নিলেশ বলে ‘স্যার আমি করিনি, বিশ্বাস করেন স্যার।’

কিন্তু হেড স্যার কিছু বলার আগেই ক্লাস টিচার নিলেশকে মারতে শুরু করলো। নিলেশ মার খেতে খেতে মেঝেতে পড়ে গেল, কোনো টিচার ঐ স্যারকে থামাতে পারলো না। তাই দেখে ডিংডং আবারো ঐ টিচারের হাত উঁচু করে দিলো।

এবারে তাই দেখে হেড স্যার বলল, ‘আপনি শুধু শুধু মারলেন নিলেশকে, এবার তো আপনার হাত আমাদের সামনেই আর নামাতে পারছেন না। ছি ছি এ কী করলেন আপনি?’

ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা না জেনে, না শুনে কথা বলেছ। একজন কষ্ট পেলো, এটা করা কী ঠিক হলো।’ টিচাররা সকলে নিলেশকে নিয়ে বাইরে চলে গেলেন। ডিংডং নিলেশের মাথায় হাত ছোঁয়াতেই ওর জ্ঞান ফিরে এলো।

ওকে পানি খাইয়ে ক্যান্টিন থেকে এক গ্লাস দুধ এনে খেতে দিয়ে হেড স্যার বললেন, ‘তুমি আজ বাড়ি যাও। আমরা খুবই দুঃখিত।’ স্যারদের সালাম দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো নিলেশ।

স্কুল থেকে বাড়ি যেতে পারছে না নিলেশ। ডিংডংকে না-নিয়ে কেমন করে যাবে নিলেশ, ওকে না-নিয়ে বাড়ি যেতে পারবে না। ও যাই করুক, ওতো বন্ধু। তা ছাড়া ওকে কথা দিয়েছে কখনো ছেড়ে যেতে বলবে না ওকে। কিন্তু ডং কোথায়?

নিলেশ বাইরে মাঠে এলো। খুব আস্তে আস্তে ডাকলো, ‘ডং কোথায় তুমি, ডং।’ ডিংডং-এর সাড়া পাওয়া গেল না। আরো ক্লাস আছে, কিন্তু মন চাইছে না ক্লাসে যেতে। তা ছাড়া হেড স্যার বলেছেন বাড়ি যেতে।

ডংকে খুঁজে না-পেলে তো বাড়ি যেতে পারছে না, পারবে না নিলেশ। বসে রইলো মাঠের কিনারে আম গাছের নিচে। আনমনা বসে আছে। অপেক্ষা করছে ডিংডং-এর। ডং আসছে না। ডং-এর বদলে এলো একটি মেয়ে।

মেয়েটি ডাকছে, কিন্তু শুনতে পাচ্ছে না নিলেশ। মেয়েটি ওর পাশে বসলো, তবুও খেয়াল করলো না নিলেশ। মেয়েটি ওর মাথায় হাত রাখলো। তখনো দেখতে পেলো না মেয়েটিকে, অনুভবও করতে পারলো না। মেয়েটিকে দেখতে না-পেলেও, দেখতে পেলো ডিংডংকে।

উড়ে যাচ্ছে ডিংডং। ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে ডং। ওর দুই চোখ ভরে কান্না এলো। মনে মনে বলল, ডং ফিরে এসো, ফিরে এসো ডং। তুমি ছাড়া তো আমার ভালো লাগে না, লাগবে না! ডং ফিরে এসো, ফিরে এসো।’

ডিংডং ওর মনের কথা বুঝতে পারলো, উড়তে উড়তে বলল, ‘বন্ধু ভালো থাকো, ভালো থাকো তুমি। যদি তোমার মনে থাকে আমাকে, তবে আবার কোনো একদিন আসবো আমি। আমি তো তোমার বন্ধু।’

হাত নাড়তে নাড়তে উড়ে গেল ডিংডং। জলচোখে সেদিকে চেয়ে রইলো নিলেশ।

স্কুল থেকে বাসায় ফিরলো নিলেশ। মন খুব খারাপ। সন্ধ্যায় টেলিভিনের খবর শুনতে পেলো নিলেশ। একটা নতুন অসুখ এসেছে বাংলাদেশে। এটা নাকি চীনের উহান থেকে ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো বিশ্বে এই রোগ ছড়িয়েছে। এই রোগ ছোঁয়াছুঁয়িতে বাড়ে, হাঁচি-কাশিতে বাড়ে, জ্বর হয়, আর মানুষ মারা যায়।

বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে সরকার। কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা করা হয়েছে, মাস্ক অবশ্য পড়তে হবে। নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামে পরিচিত এই অসুখ। স্কুল যেতে পারবে না—মনে হতেই চোখ জলে ভরে উঠলো নিলেশের!

(সমাপ্ত)

…………………

পড়ুন

কবিতা

আফরোজা অদিতির পাঁচটি কবিতা

গল্প

রাত ভোর হতে আর কত দেরি

শিশুতোষ উপন্যাস

নিলেশ ও ছোট্ট ভূত : পর্ব ১পর্ব ২পর্ব ৩পর্ব ৪পর্ব ৫পর্ব ৬পর্ব ৭পর্ব ৮পর্ব ৯, পর্ব ১০ (শেষ)

মুক্তগদ্য

অর্থ এক বিলাসী প্রেমিক

ভ্রমণ

গোকুল মেধ বা বেহুলার বাসরঘর

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণকথা – ২য় পর্ব

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি

দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও রাণী রাসমণি – ২য় পর্ব

Spread the love