shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

Ten poems by Prodip Mitra
Ten poems by Prodip Mitra

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

দাবায়া রাখবার পারবা না
পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম
সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম
……… ………—শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

ছলকে ওঠে হৃদয় নদী

ছলকে ওঠে শ্রাবণ হাওয়া

একই সাথে ছলকে চলা

বিশ্বকবির চোখের চাওয়া

বাংলা ভাষার পঙক্তিমালা।

.

শ্রাবণ আকাশ ছলকে রে

কৃষকবধূর বুকপাঁজরে

বেতবুনিয়ার বাঁশের আড়া

তাঁত-মাঝিদের চোখের তারা।

.

হৃদয় মাঝে কিংবদন্তি

সংগ্রামের ঐ জয়ধ্বনি

জয় বাংলার মর্মবাণী

ঐ আকাশের উদার পঙক্তি।

.

ছলকে ওঠে, ছলকে ওঠে

নিখুঁত চোখের দৃষ্টিরেখা

দিব্যপথের অভয়সখা

এক মুজিবের অনেক কথা।

.

মুজিব আমার গৌরদেহী

সাংখ্যযোগের কপিলমুনি

ছলকে ওঠে পতঞ্জলি

যাগবল্ক্যের বেদধ্বনি।

.

ছলকে ওঠে ভোরের আকাশ

চন্দ্রমার ঐ জল-জাঙ্গলা                  

সোনার কাঠির জয়ের বাতাস

………: আমার সোনার বাংলা…।

.

ছলকে ওঠে মোহরঝাঁকা

শত্রুপক্ষের গোপন খাড়া

রক্তগঙ্গার একটি ধারা

শাসক তোমায় মানব না…।

.

গোপন আঁতাতে ছলকে ওঠা

চোখের ওপর ধুলোর খেলা

তার বিপরীত একটি ঠেলা

ঐ মুজিবের বুকের পাটা…।

.

ছলকে ওঠে লোকের পাড়া

দোয়াত-কলম বর্ণব্যথা

সংবিধানের সৌধধারা

কৌটিল্যের অর্থকথা।

.

ছলকে ওঠে খনার জ্যোতি

মঙ্গাভাঙ্গার চাষেরবিধি

ঝড়-কবলের দ্বীপের বাতি

বঙ্গ-সাগর মূর্তরতি

বুকের ভেতর মুজিব নীতি

গড়ব এবার সোনার-ভূমি।

.

ছলকে ওঠে সাতই মার্চ

শুদ্ধ বুকের ঐ যে আওয়াজ

মুজিব কণ্ঠের একটি আঁচ :

………‘দাবায়া রাখবার পারবা না…।’

.

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভলোবাসি…

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

বাংলাদেশের রূপের ভেতর

বাংলাদেশের রূপের ভেতর রূপটা কেমন

নদীর শোভার ঢেউয়ের মতন

নদী যেমন ছলকে চলে, টলকে চলে

গমক ঘোরা গতির টানটা তেমন…।

.

গতিটা তার দেখার মতন

উত্থাল-পাথাল ঢেউয়ের ঢেউ

খেই হারিয়ে যায় যে কোথায়

যায় যে কোথায়, যায় যে কোথায়…!

.

বাংলাদেশের রূপের ভেতর একটা রূপ

আছে গোপন, গোপন সভায়

গোপন আভা হঠাৎ করেই আলো ছড়ায়।

তার আলোর ভেতর অনেক কথা

………হৃদয়হরণ রঙের বরণ

………মুগ্ধ চোখের দীপ্ত বরণ

………উঠছে হেসে আকাশগগন…।

.

বাংলাদেশের রূপের ভেতর অনেক রূপ

পাহাড় শোভার আলতো দোলন

………দুলকে ওঠা গূহ্যগুহা

………ধ্যানী কোনো ভিক্ষুর নয়ন…।

তারি মধ্যে শঙ্খচিল, ধনেশপাখি

গাইছে গান সেরিবান, সেরিবান…!

নীলগিরি আর কেওড়া কেডাং

হাতপ্রসারি হাতটা অমন

দুঃখভাঙ্গা প্রাণটা যেমন…!

.

বাংলাদেশের রূপের ভেতর বইছে হাল

খেত-খামারের খামারকান্দির ঘ্রাণঝরা প্রাণ

মুখটা তার চন্দ্রশোভার শোভার মতন

তারই মধ্যে আকাশ-তারার অনেক আলো

ডাকছে পাখি; ডাকছে মাঝি, ডাকছে ঐ

দুপুরভাঙা ঘুঘুর সুর…। ঐ না সুরে

উঠছে ভেসে খেত-খামারের ঐ তো ঐ

অনেক হাত, অনেক জাত, অনেক পাট…।

.

বাংলাদেশের রূপের ভেতর কখন আপনি

আপন হাতের কাজের আলো ছড়িয়ে অমন

কখন এসে সামনে দাঁড়াও,—ও জননী!

বাংলাদেশের হৃদয় মাঝে কখন আপনি…

.

মানবতা

তিনটে চা দুটো রুটি

একটা কলা, তিনটা পানি

দামটা কত? একশ টাকা

দিচ্ছি, বাকিটা ফেরত দিবি!

.

আওয়াল-বাদল; মিলন-প্রদীপ

ভর-দুপুরে, চায়ের স্টলে

দিচ্ছে চুমুক চায়ের কাপে

দুটো রুটির তিনটা ভাগ

তার সাথে একটা কলা

একই ভাবে হলো রে ভাগ

খাচ্ছে তারা বেজায় তেড়ে

শেয়াল তাড়া ক্ষুধার ঠেলা…।

.

হাতের টাকা বেজায় কড়া

কড় কড়া পেট, মেঘের পাড়া

দিচ্ছে সাড়া, ক্ষুধার বাতি

নিভবে বুঝি? যা যা এখন!

এসব কথা বড্ড বাতিল

শূন্য পুরাণ এখন যেমন…!

.

পায়ে পায়ে ক্ষুধার নূপুর

হাত বাড়িয়ে ডাকছে সবুর

বৃষ্টিঝরা ভাতের থালা

ক্ষুধার মুখে আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা…!

.

আমরা তবু কাজের নেতা

ডেকে যাই আয়রে আয়

মানবতা, মানবতা

হাতের ভেতর ক্ষুধার পাতা…।

.

ও বুবু তোর ক্ষুধার ডালা

উল্টে দেখা পাল্টে দেখা…।

.

খবরদার, ক্ষুধার কথা বলবে না!

………শুনলে কবি নজরুল, কবর

থেকে আসবেন উঠে। তখন তিনি,

………বেজায় চটে করবেন রগড়!

.

জলকে চলা, জলকে বলা

ঐ আকাশ বুকে রূপের ঝলক

ঘুমভাঙানিয়া পাখির ঠোঁট

ঝলকমারা ভোরের রোদ

দেখতে কেমন? ঐ না রূপের ঝলক!

.

হৃদয় আমার উধাও হাওয়া

মেঘ-মেদুরে আলোর চাওয়া

পাগলপাড়া রোদের দলা

পাখির মতন ছুটে চলা

ঐ না রূপের মোহনবাঁকা হাস্যটা

পিয়া পিয়া পিউ তৃষ্ণাটা…।

.

যাচ্ছে ছুটে হৃদয় আমার

উজান গাঙ্গের নায়ের টানে

পালতোলা ঐ মাঝির গানে

ছলকে ওঠা হৃদয় আমার

মোহন রূপের রূপের মাঝে

কেমন করে যাচ্ছে ছুটে

ছুটে চলা ঐ পাখির ঠোঁটে

ছলকে ওঠা হৃদয় আমার…!

.

হৃদয়হরণ    ………….পাখনামেলা

রোদের দোলা  ………মেঘের মেলা

পাতার আভা  ………জলের ডোবা

জলকে চলা   ………..জলকে বলা…।

না বলার ঐ  ……….রূপের রেখা

আমার চোখে  ………হচ্ছে আঁকা

কাজল কালো  ………ভ্রমর সখা

দিচ্ছে ডাক   ………..আয়রে সখা…!

.

আয়রে আয়, হৃদয়হরণ

আলতাবরণ বাউলচরণ

বুকের ভেতর রূপের নাচন

উত্থাল-পথাল চোখের স্ফুরণ…!

.

অবুঝ বুকের সবুজ কোষ

সামনে আমার কে হে তুমি?

মোহভঙ্গের নিখুঁত কোষ

এ যে আমার জন্মভূমি, জন্মভূমি…!

.

বেচব না, বেচব না

কী যেন কী

হাতের মুঠোয়

পদ্মদীঘির—পদ্ম যেন!

.

কী যেন কী

মনের ভেতর—প্রাণ

ঐ না প্রাণের

অনেক ব্যথা

হঠাৎ উধাও!

সকাল বেলার

আলোর বন্যা—বন্যা!

.

বলি, এ কি, এ কী

কিরে কী? দেখি!

না দেখাব, না শোনাব

অমন শোভন, রূপের কথন

বাড়ির ভেতর অনেক জন—অনেক জন!

.

আজকে আমার

হার হলো না

জিত হলো না

একলা থাকা?

তাও হলো না

তাও হলো না…!

.

প্রাণের ভেতর প্রাণের খেলা

বেচব না, বেচব না

(এ) কোথাও আমি, বেচব না

বেচব না ভাই, ঐ রক্তদোলা…।

.

বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যাবেলা

বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যাবেলা, হয়নি পড়া;

হয়নি খেলা। ঘরের ভেতর একলা থাকা

বাবার ডাকে কানটি খাড়া; মনের ভেতর ব্যথার ঝাঁকা

ভয়ের দোলা; বাবা, ফিরবে কখন ভিজে-ভুজে ঝুপঝুপা!

.

মায়ের রান্নাঘরে বাটনা বাটা। খড়িগুলা সব

দড়িবাঁধা; দরদরা দর বৃষ্টিছাঁট। হাঁসেরা সব

ডুব সাঁতারে সরব কেমন। বিলের জলে মাছের

ঝাঁপ; টিনের চালে বেজে ওঠে কোন সে রব…।

.

গাঁয়ের পথে কাদার সোঁত। হাটের ভেতর হাঁটা

বেজায় ল্যাঠা। পা টিপটিপ; বৃষ্টির ভেতর আরো বৃষ্টি

ঢল ঢলা ঢল ঢলের বৃষ্টি; নাও-মাঝিদের খাল-খাড়ি

উঠছে হেসে ঝাঁকবাঁধা মাছ; মাছের ঝাঁক…।

.

পড়ার টেবিল, খাতা পেনসিল বৃষ্টিভরা মেঘের লাইক

চলছে ছুটে আপনজন; কোন সে সুদূর দূরের দেশ

যাচ্ছে যেন রাজার ছেলে। হাতি-ঘোড়া পেয়াদা-পাইক

শঙ্খচিলের ডানাটা তার আকাশ-তারার হৃদয় কেশ…।

.

সকাল থেকে ঝরছে বৃষ্টি। বিরামহীন! ডোমপুকুরের

জলের দীঘি তলিয়ে গেছে; আমন ধানের খড়ের পালা

কোমরভাঙ্গা দাদুর যেমন নোয়ানো মাথা। এই দুঃখটা

অনেক ভারী; গরুগুলা সব খাবে কী?

.

চুমুলাঙ

মন চলে যায় বাইশাবাড়ি

ভাবনাখালী, নাইক্ষ্যাংছড়ি।

পাতার ভেতর পাতার নাচন

মেঘ-মেদুরে আকাশ স্ফুরণ।

.

তঞ্চগ্যা বাড়ি, কলার ঝুড়ি

হাতে তাদের কাঁথার নকশি

কাঠের বাড়ি, লতার দড়ি

মাচার উপর নাচ্ছে খুকি…!

ঐ খুকিটি দেখতে ভারী

হাতটি কচি, ভরছে তুলি

‘ও বোকা, তুঁই কেমন আছিস?

লেবু সরবত একটু খাবি…!’

.

মন ভুলানো আকাশরাঙা

হাঁড়ির মুখ খুলেই দেব

বন মইষের দৈ…। আবার,

মেঘ-কেয়ুরে ছলকে ওঠা

কলার পাতা গাছের গোটা

ঝণা ধারায় স্নানের ঘড়া

সন্ধ্যাবেলার সূয ডোবার

প্রাণ জুড়ানো হংসছড়া…।

.

মন চলে যায়, বাইশাবাড়ি

ভাবনাখালী, নাইক্ষ্যাংছড়ি

পাহাড় শোভায় জড়িয়ে ধরা

একটি খুকির পাঠের পড়া…।

.

খেং খেং খেং খেং ধুরুক ধুরুক

চুমুলাঙ চুমুলাঙ সেবিরান

জাদিপৈ, তুই কুরুত্তে?

গেংখুলি, রাধামন-ধনপুদি…!

.

হাতের ভেতর কাজ

হাতের ভেতর কাজ

কাজের ভেতর হাত

হাতের ভেতর হাত

কাজের ভেতর কাজ…।

.

ঐ না কাজের ডাক

ঐ না হাতের ডাক

হাটের মতন বইছে প্রবল

আকাশরাঙা সূয ধবল

আষাঢ় জলের বৃষ্টি যেমন

শস্য মাঠের রূপটি তেমন

পাখিদের ডাকটি যেমন

নদীটার গতি কেমন?

.

ঐ না আমার হাতের কাজ

এই না আমার কাজের হাত

রাঙিয়ে যায় বিশ্বভুবন

পূর্ণিমার চাঁদটি যেমন…!

.

কাঁদছি

আরবি ভাষায় পড়লে বাদ একটা নোক্তা;

শব্দপাঠ ক্রুদ্ধচোখে হাত পাকায়। দুঃখ হয়,

রক্তস্নাত বাঙলা ভাষার হস্ চিহ্ন পড়ছে বাদ

ব্যঞ্জন বণের পঞ্চদশ মূধণ্য ‘ণ’ বেজাত

হাতে হচ্ছে বেজায় বাজেয়াপ্ত। উজ্জ্বল গতির ‘ব-ফলা’

তার উপরেও নাজাত হাতের চলছে খুব

খুন-খারাপি। এখন ‘সে’ লিখছে আমায় ‘শে’

এই না ভাবে ‘বরকত’ বুঝি হবেন কবে ‘বকত’।

.

এ ভাবেই ভাষাশহীদ ডুকরে কাঁদেন গভীর রাতে

মান্যস্তম্ভ শহীদ মিনার সাক্ষী আছেন, আভিধানিক

নিয়ম-কানুন। আমার উচ্চ বুকের উঁচু

হাতের চন্দ্রবিন্দু ‘ঁ’; ও আমার শিব কপালের শোভন

শোভায় থাকত সেঁটে। অমন শোভাও হারিয়ে

আমি মলিন বেশে কাঁদছি খুব, কাঁদছি…।

কাঁদছি আমি, আন্দোলনেরই অশ্রু দিয়ে লেখা

রক্তগাঁথা রক্তধ্বনি : ‘শহীদ দিবস অমর হোক।’

এই ধ্বনিটিও বেকুব হাতে হচ্ছে শহীদ। বলি,

ঐ না  ঐ ‘শহিদ’ লেখার ফরমান আমি কেমনে মানি

আকাশকাঁপা আন্দোলনেরই হৃদয়দোলা

ও আমার দেশের বাণী; ও আমার দেশের রক্ত-ধ্বনি…।

.

শীতলপাটি

হাদারপাড়া বিছনাকান্দি পাহাড় শোভার ঝর্ণাধারা

নীল জলেরই স্রোতের দোলা, পাথর পাতার আকাশপাড়া

পাতার ভেতর পাথর শোভা, পাথর স্রোতের জলের আধার

পিয়াইন নদীর বাঁকের ভেতর অনেক পাখির খাদ্য-খাবার।

.

ঝিরঝিরা ঐ মেঘের উঁকি, বাতাস পথে উড়ছে খুকি

দু’হাত তুলে বলছে সে : আহা! এ কি দেখি; এ কী দেখি?

শঙ্খচিল ডাহুকপাখি, একটা শামুক! দেখতে কেমন? কেমন,

বন-হরিণার পিঠটা যেমন। ওই যে ব্যাঙ! চোখটা তার সোনার বরণ।

.

জলের ফোঁটা গলগলিয়ে পড়ছে যখন

মস্ত-ব্যস্ত হাতিরা শুঁড়টা ঐ উঁচিয়ে তখন

গাইছে গান : ও আমার দেশের মাটি

তোমার জন্যে গাঁথছি আমি শীতলপাটি…।

…………………

পড়ুন

কবিতা

ও ভাই : প্রদীপ মিত্র

প্রদীপ মিত্রের দুটি কবিতা

প্রদীপ মিত্রের হাওয়ার ঢেউ

প্রদীপ মিত্রের দশটি কবিতা

মতামত

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা – ২য় পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...