shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

এই উত্তর জনপদের টাউন শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চার ইতিহাস খুব বেশি দিনের না। দেশভাগের আগে এখানকার সামন্ত জমিদারদের নিজস্ব পত্রিকা ছিল, ছিল প্রেসও। যত না বাণিজ্যের কারণে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন—তার চেয়ে অধিকতর দৃষ্টি ছিল শিল্প-সাহিত্য চর্চার পরিসর নির্মাণ করা।

যে সময়ে শেরপুরে মূদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়, তখন টাউন শেরপুর নিতান্তই প্রান্তিকের প্রান্তিক—এক পাণ্ডববর্জিত অঞ্চল। তবু এখানে ‘বিদ্যোন্নতি সাহিত্য চক্র’ গঠিত হয়ে গেছে, বেরুচ্ছে মাসিক ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’ (১৮৬৫)—সামন্ত জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরীর প্রযত্নে বিখ্যাত পণ্ডিত চন্দ্রমোহন তর্কালঙ্কারের সম্পাদনায়। অন্যদিকে, জগন্নাথ অগ্নিহোত্রির সম্পাদনায় ‘বিজ্ঞাপনী’ (১৮৬৬)।

প্রান্তিকের প্রান্তিক টাউন শেরপুর হতে দুই দুটি পত্রিকা বের হচ্ছে। চাট্টিখানি কথা নয়। পত্রিকা থাকবে আর গ্রাহক পাঠক থাকবে না—তেমন তো হতে পারে না। কাজে কাজে মূদ্রন যন্ত্র স্থাপন করে পাঠকের সাথে সম্পর্কায়ন দ্রুততর করা।

প্রথম দিকে ঢাকা থেকে ছাপিয়ে আনতে হতো। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই বাঁচে। শিল্প সাহিত্য দর্শন চর্চার পরিসর বাড়িয়ে দেবার যে আকুলতা সামন্ত হরচন্দ্র চৌধুরী ভেতর ছিল তাকেই অধ্যাপক মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘এখানেই শিল্পী হরচন্দ্র চৌধুরী সামন্ত হরচন্দ্রকে পরাজিত করে স্বাধীন শৈল্পিক সত্তায় জাগ্রত ও স্পষ্টবাক।’

সামন্ততন্ত্রের গভীরে তখন নয়ানী জমিদার ও পৌনে তিন আনি জমিদারদের ভেতর যেমন শরিকি হিস্যা ঈর্ষা দ্বেষ বাড়ছিল, একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল কল্যাণমুখী নানা কায়কার। একপক্ষ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন তো আরেক পক্ষ বছর না-ঘুরতেই আরেকটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তেমন পাল্লা দিয়ে পারিবারিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা বা পত্রিকা প্রতিষ্ঠা।

এই পাল্টাপাল্টির ভেতরই জন্মগ্রহণ করেন জন্মে হিরন্ময়ী দেবী। তিনিই এই উত্তর জনপদের প্রথম নারী কবি হিরন্ময়ী দেবী চৌধুরী। ১৯২১ সালে ‘পুস্পাধার’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। যদিও…. ‘পুষ্পাধার সাধারণের মধ্যে প্রকাশিত হইল না’২৫ বইটির ভুমিকা লেখেন আড়াইআনী জমিদার শ্রী গোপাল দাস চৌধুরী।

প্রথম পত্রিকা ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’ প্রকাশের চার বছর পর ১৮৬৯ সালে টাউন শেরপুর পৌরসভা ঘোষিত হয়। ময়মনসিংহকেও একই বছর পৌরসভা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এপ্রিল আটে ময়মনসিংহ, জুনের ষোল শেরপুর।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

নিশ্চয় এই প্রান্তিকের প্রান্তিক ব্রিটিশের অর্থনৈতিক সূচকে শেরপুর তখন রাইজিং জোন—রাজনৈতিক প্রশাসনিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতির স্পেস বিদ্যমান ছিল।

এই আর্থসামাজিক বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে আরো যতটুকু শেরপুরের বিকাশ ও বিস্তরণের দরকার ছিল, ততটুকু বলতে গেলে হয়নি। কেন হয়নি তার কার্যকারণ ও পর্যালোচনা—যোগ্য কোনো সমাজতত্ত্ববিদ করবেন, সেই ক্ষেত্র আমার না।

দেশভাগ পূর্বের দালিলিক প্রমাণপত্র পেতে আমাদের হাত পাততে হচ্ছে হরচন্দ্র চৌধুরী প্রণীত ‘সেরপুর বিবরণ’ (১৮৭২), অথবা বিজয় চন্দ্র নাগের ‘নাগ বংশের ইতিহাস’ (১৯২৭), অথবা হাল আমলে প্রকাশিত নয় আনী জমিদার বাড়ির উত্তরধিকার গোপা হেমাঙ্গী রায়ের ‘সোনার খাঁচার দিনগুলো’ (২০০৪) উপর।

স্থানিক কোনো আর্কাইভ বা পুরাতন পাঠাগার না-থাকার (ইতিহাস চেতনা না-থাকার কারণে কালের প্রকোপে অথবা কর্তা ব্যক্তিদের অবহেলায় ধ্বংশ হয়ে গেছে) দরুণ তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত কোনো পত্রিকা বা স্মরণিকা আমাদের হাতে নেই। থাকলে হয়তো টাউন শেরপুরের যাত্রা পথটুকু বেশ ভালোভাবেই জানা যেত।

পরবর্তী সময়ে যারা টাউন শেরপুরে নিয়ে কাজ করেছেন, যেমন—অধ্যাপক দেলওয়ার হোসেন, পণ্ডিত ফসিহুর রহমান বা হাল আমলে মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ—তারা কেউই ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত টাউন শেরপুরে সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কোনো দালিলিক তথ্যাদি হাজির করেননি, কোথাও কোথাও ঘটনার তারিখ লিখেই ইতিহাসচর্চার কর্তব্য সম্পন্ন করেছেন।

তবে যতটুকু তাদের সামর্থ্য (একক ব্যক্তি কতটুকুই আর করতে পারে!), ততটুকু দিয়ে তারা তাদের কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। শুরু তারা করে গেছেন—এখন বাকি মিসিংলিংক সন্ধান ও পর্যালোচনার করে যোগসূত্র স্থাপন। এভাবেই তৈরি হবে অতীতের সাথে বর্তমানের সংযোগ সড়ক। তার দায় ভাগ এই প্রজন্মের!

স্থানিকে সমাজ কারিগরিদের সন্মান জানানো এবং তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেবার এই একমাত্র পথ—তাদের নানামুখী কাজের ভাবের নানাদিক নিয়ে আলোচনা করে পর্যালোচনা করা, তাদের সময় ও কাজের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পরিসর সৃষ্টি করা।

স্থানিক ইতিহাসের উপাত্ত সংগ্রহ বিশ্লেষণ করে যথাযথ ভিত্তি রচনা ছাড়া জাতীয় ইতিহাস বিকাশ লাভ করে পারে না। ইতিহাস শুধুমাত্র কতিপয় তারিখ আর গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষের নাম নয়। নয় জলাবদ্ধ পুকুরের ভাগাড়—ইতিহাস একটি জীবন্ত ব্যাপার।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

যা আমরা হারিয়েছি তা তো গেছেই কালের গর্ভে যতটুকু এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে—হোক না ধর্ম কিংবা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি বা পরিবার সমাজ ক্ষেত্র—তার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ রাখা—ভাবী কালের সমাজভাবুকদের জন্য।

সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই যতটুকু সম্ভব টাউন শেরপুরের ছোটকাগজ চর্চার হদিস আনা বা উপাত্ত হিসেবে হাজির রাখা। সব যে পেয়েছি সেই দাবি করব না—যতটুকু পেয়েছি হোক সে স্মরণিকা ভাঁজপত্র স্কুল কলেজের বার্ষিকী বা সাহিত্য পত্রিকা কিংবা নানা সংগঠনের সংকলন—সকলকে ‘ছোটকাগজ’ ডাক নামে একত্রে হাজির করা।

একে অপরের যোগসূত্রতা বা বিচ্ছিন্নতা তুলে ধরা—কিংবা বলা যেতে পারে প্রকাশিত নতুন পুরাতন ছোটকাগজ একজন পাঠকের এক ধরনের পাঠ ও পাঠোত্তরে টুকিটাকি মন্তব্য এবং লিখিয়েদের নানা কথাবার্তার সময়ের লেখচিত্র মাত্র।

দেশ ভাগ উত্তর তরুণ সুশীল মালাকার হাতে লেখা পাক্ষিক পত্রিকা ‘কিশোর’ (১৯৫৭) দিয়েই টাউন শেরপুরে ছোটকাগজের যাত্রা শুরু। সহ সম্পাদক অধির দাসকে নিয়ে ‘বছর খানিক ধরে’ প্রকাশিত হয়েছিল।

ষাটের দশকের শেষদিকে সুশীল মালাকার ও মোজ্জামেল হকের যৌথতায় সাহিত্য পত্রিকা মাসিক ‘দখিনা’ (১৯৬৭) বের হয় নিউ প্রেস থেকে। এটিই টাউন শেরপুরে ছাপা পত্রিকার যাত্রা বিন্দু—এইটুকুই তথ্য হিসেবে হাজির।

১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭-এর মধ্যে ‘কিশোর’ ছাড়া অন্য কোনো সাহিত্য পত্রিকা বা স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে কিনা তার দালিলিক তথ্যাদি আপাতত পাওয়া যায়নি। হয়তো হয়েছে হয়তো-বা না। এতটুকু মেনেই ১৯৭০ সাল থেকেই তথ্যাদি সূত্রাবদ্ধ করতে থাকি।

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন তাদের আর্দশিক লড়াই শুধু মিছিল বা মিটিংয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ না-রেখে বিভিন্ন দিবসভিত্তিক স্মরণিকা প্রকাশের ভেতর দিয়েও চর্চা করে গেছে। এখনকার ছাত্র রাজনীতির রূপ যাই হোক না কেন—স্বাধীনতার আগে-পরে ছাত্র সংগঠনগুলো স্মরণিকা প্রকাশকে হাতিয়ার করেছে।

শিল্প-সাহিত্য-দর্শন চর্চার ভেতর দিয়ে রাজনৈতিকতার চর্চা করেছে। টাউন শেরপুরে এই দুটি সংগঠনের স্মরণিকাগুলো : আবাহন (১৯৭০), লাল পলাশ (১৯৭০), সূর্য্য অন্বেষা (১৯৭০), রক্তের স্বাক্ষর(১৯৭১), ওরা মরণজয়ী (১৯৭২), স্পন্দিত শোনিত (১৯৭৩), অগ্রণী (১৯৭৩), অঙ্গন (১৯৭০), ঘোষণায় আমরা (১৯৭২), নন্দিত নবীন (১৯৭৪)।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

শেরপুরে শ্রমিক সংগঠনও সাহিত্য পত্রিকা করেছে। সাতের দশকের শেষের দিকে মূলত জাসদের প্রভাব বলয়ে এই শ্রমিক সংগঠনগুলো গড়ে ওঠেছে। সমর্পন (১৯৭৯) প্রলেতারিয়েত (১৯৮০) শ্রমিকদের মে দিবসের পত্রিক। এ ছাড়া জাসদ ছাত্রলীগ তাহেরের ফাঁসির পর আরো দুটি স্মরণিকা বিস্ফোরণ (১৯৮০) লাল সালাম (১৯৮০) প্রকাশ করে।

গোষ্ঠীভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতা শুরু করে কৃষ্টি প্রবাহ। সাহিত্যচর্চা তাদের লক্ষ ছিল না। ছিল গান নাটক নৃত্য ইত্যাদি চর্চা ভিত্তিক কার্যক্রম। বিভিন্ন সময়ে তারা বুলেটিন বা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করলে কবিতা বা গল্প নিবন্ধ নিয়েই প্রকাশ পেতো। স্থানিকের বৈশিষ্ট্যই এমন। প্রবাহ (১৯৭৪) তাদের নিজস্ব কাগজ।

শহীদ মোস্তফা থিয়েটার নানা তৎপরতার ভেতরও নাট্য বিষয়ক কাগজ ‘নাট্যপত্র’ (২০১০) প্রকাশ করে। অন্যদিকে, উদীচী আর্দশভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। আটের দশকেই শেরপুরে তাদের কার্যক্রম বিস্তার লাভ করে।

উদীচী নির্দিষ্ট লক্ষ-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আজো শেরপুরসহ সারাদেশে সমাজ রূপান্তরের জন্য সাংস্কৃতিক লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাদের মুখপত্র বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে বের হয়েছে। যে ক’টি পাওয়া গেছে—ব্রজে বাজে বাঁশী(১৯৮৬), অঙ্হিকার (১৯৮৫), মৃৎ(২০০৮), ইস্ক্রা (১৯৮৫), প্রস্তুতি (১৯৮৬), ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল(১৯৮৮), রক্তপদ্ম(১৯৮৩) ইত্যাদি।

‘পাতাবাহার’ দুলাল দে বিপ্লবের প্রতিষ্ঠিত শিশু কিশোর সংগঠন। ১৯৭২ সালে যুদ্ধ থেকে ফিরেই দুলাল দে এই খেলাঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যে প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দেন—এই শেরপুর অঞ্চলে অনেকের মতো তিনিও সেই যুদ্ধে অংশ নেন এবং জামালপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সন্মুখযুদ্ধে শহীদ হন।

স্থানিকে কর্মতৎপরমুখী এই খেলাঘরের সাময়িকীগুলো হলো—প্রতিধ্বনি(১৯৮৯), অঙ্গিকার(!), চেতনা(১৯৭৭)। এ ছাড়া বৈতালিক কচিকাঁচার বার্ষিক মুখপত্র—কচিকাঁচা (১৯৮৫), আর শিশুদের জন্য শিশুদের পত্রিকা ‘দুরন্ত’(১৯৮৮)-ই একমাত্র টাউন শেরপুরে শিশুতোষ পত্রিকা, যেখানে সম্পাদকদ্বয় যথেষ্ট মাঠ প্রস্তুতি করেই শুরু করেছিলেন, কিন্তু গোটা তিনেকের পর হাল ছাড়তে হলো।

শেরপুর সাহিত্য পরিষদ গঠনে কবি আবদুর রেজ্জাক অনুঘটকের ভুমিকা পালন করেছেন। অগ্রজ এই কবি দীর্ঘদিন সাংগঠনিক তৎপরতার ভেতর দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করে গেছেন। বিভিন্ন নামে কাগজ করলেও, ‘কালিক’ ছিল তাঁর সম্পাদিত সবচেয়ে ভালো একটি সাময়িকী। এ ছাড়া, উচ্চারণ (১৯৮২), কালিক (১৯৯৩), অন্বেষা (১৯৮১), স্বরনিকা(১৪১০), স্পন্দন (১৪০২)।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

তা ছাড়া কলতান গোষ্টীসহ আরো কয়েকটি সংগঠনের নিয়মিত-অনিয়মিত ছোটকাগজগুলো হলো—আমরা তোমারই সন্তান (১৯৯১), সমর্পন (১৯৭৯), বিজয় কেতন (১৯৮৩), ক্ষোভ (১৯৮১), অংকুর (১৯৯০), কংস(১৯৯০), অনুশীলনী (১৯৯২), ধী (১৯৯২), বালার্ক (১৯৯৯), রক্ত ঝরা একাত্তর(১৯৯৫), বিহান(২০১৮)।

গত শতকের আটের দশক টাউন শেরপুরে যেমন একের পর এক সাহিত্য গোষ্ঠীর জন্ম নিয়েছে, তেমনি মৃত্যু ও অপুষ্টির হারও উর্ধ্বমুখী। চিন্তার জাড্যতা ও অধিকতর সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং শুধু কমিটি সর্বস্ব সাহিত্য গোষ্ঠী হবার কারণে টিকে থাকতে পারেনি।

তবে একমাত্র বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর প্রযত্নে প্রকাশিত ‘মানুষ থেকে মানুষে’(১৯৮০) কাগজটি ধারাবাহিক প্রকাশের ভেতর দিয়ে তারা তাদের নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

টাউন শেরপুরে লাইব্রেরির চলার পথ ১৯২৬ থেকে। রিডিং ক্লাব নামে প্রতিষ্ঠিত সেই সময়ে ‘টাকা ডিপোজিট’ রেখে গ্রাহক বাড়িতে বই নিয়ে যাবার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে যাত্রা শুরু—সেটিই আজকের খান বাহাদুর ফজলুল রহমান জেলা সরকারি গ্রন্থাগার।

আটের দশকে কয়েকজন উদ্যোগী সংস্কৃতজন গ্রন্থাগারের পক্ষে ‘উচ্চারণ’ (১৯৮৬) নামে একটি চমৎকার সাময়িকী প্রকাশ করেন। নির্দিষ্ট প্রান্তিকে বের হবার প্রতিশ্রুত হলেও, ‘উচ্চারণ’ আর উচ্চারিত হয়নি।

দীর্ঘদিন বোবা কালা হয়ে পড়ে থেকে অবশেষে সাংবাদিক হাকিম বাবুলের তৎপরতায় জেলা প্রশাসক মো. নাসিরুজ্জামানের প্রযত্নে আবারো গ্রন্থগার ‘ধ্বনি-১’ (২০১০) ধ্বনিত হলেও, পুষ্টির অভাবে এখন আর কোনো স্বর ও সুর নেই।

তবে আশার কথা, বর্তমান গ্রন্থাগারিক সাজ্জাদুল করিম নানামুখী কর্মতৎপরতা চালিয়ে গ্রন্থগারটি পাঠকবান্ধব করে গড়ে তুলছেন। তিনিও মনে করেন, ‘পাঠাগারকে আরো উচ্চকিত করতে হলে পাঠাগারের নিদিষ্ট সাময়িকী থাকা দরকার—হোক সে মুদ্রিত কিংবা ওয়েব ম্যাগ—অথবা দুটোই।’

সাহিত্য পত্রিকার লড়াই কেউ কেউ ভাবেন নিতান্তই ব্যক্তি উদ্যোগ কেন্দ্রিক। এতে সামষ্টিকের ঝামেলা নাই। স্বাধীনতার স্পেস বাড়ে। ব্যক্তিদিশাই পত্রিকার চরিত্র ঠিক করে। সম্পাদকের ভাব ভাবনার রূপায়নের জন্য এখানে রয়েছে প্রশস্ত পথ। আবার এখানে দায়ও ষোল আনা। ঝুঁকি বন্টনের সুযোগ নেই।

হয় রাগী যুবকের ত্যাড়ামী নিয়ে এগিয়ে যাও—তোমার হাতিয়ার নিয়ে নানা ঘটনাকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করে জারি রাখো রাজনৈতিকতা অথবা এক সংখ্যার পর আর্থিক বোঝা ঘাড়ে নিয়ে রণে ভঙ্গ দাও।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

আর সম্পাদকের তকমা গায়ে মেখে গেয়ে বেড়াও, ‘হ্যাঁ আমি একটি কাগজ করি। শীঘ্রই বের করব। লেখা সংগ্রহ করছি।’ লেখা সংগৃহীত হতেই থাকে হতেই থাকে, কাগজ আর বের হয় না।

দ্বিতীয় দলেই পড়ে স্থানিকের অধিকাংশ সম্পাদকেরা। যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রথমার জন্য জীবনপাত করে, প্রকাশের পর দ্বিতীয়ার দিকে টান আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। এই প্রবণতাই স্থানিক ছোটকাগজ চর্চার প্রবণতা। তাই বলে সবাই না। ঘাড় ত্যাড়া কেউ কেউ একা একা হাঁটে বহুদূর।

যারা স্থানিকে এক সংখ্যা করেই কুড়িতে বুড়িয়ে গেছেন বা ঝরে গেছেন পথের বাঁকে—সেই কাগজ সম্পাদকের কথা কী আমরা তুলব না? তাঁর শ্রম প্রেম ঘাম, চোখের ভেতরে জন্মে নেয়া স্বপ্নের কোনোই মূল্য থাকবে না? তা কী হয়?

তা হতে পারে না। কোনো নিক্তি নিয়ে স্থানিকের ছোটকাগজ আলোচনায় বসিনি। বরং যে কোনো ধরনের নিক্তিকেই সন্দেহের চোখে দেখি। এক বাটখারা দিয়ে সবকিছু যাচাই হয় না। হতে পারে না।

একেক স্থানিকে একেক রঙে রঙিন। তার উচ্চরিত ভাষা খেকে শুরু করে যাপনের সকল ক্ষেত্র আলাদা আলাদা। দেখবার চোখের অভাবে সকলের গায়ে ছড়িয়ে দেই একরূপতার চাঁদর।

আলাদাই সুন্দর। এক বাটখাড়ার চাপে ভাপে তাপে স্থানিকের আঞ্চলিক জন্মদাগ কেবলই ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে মনে হয়। তাতে গুরুত্ব ধরে না, মমত্বও ধরে না। স্থানিকের কবি কেন্দ্রে মুখগুজে স্থানিকের কাজকে মনে করে ‘হাত মকশো করার স্মরণিকা’।

একরূপতাই যেন কালের ঈশ্বর। তিনিই কেন্দ্র তিনি পরিধি। এ্যাই শালা আমার আঁকা বৃত্ত ছাড়া অন্য কোনো বৃত্ত নেই। একরূপতার কড়াল গ্রাসে হারিয়ে গেছে বৈচিত্র। স্থানিকের বৈচিত্র দিয়ে ভাষার বৈচিত্র। ভাষাজীবের বহুরৈখিকতা।

যাপনে বহুকৌনিক না-হলে কবিতা গল্প নাটকে নৃত্যতে বহুরৈখিকতা আসে না। আসতে পারে না। স্থানিকের সবিকাশ জরুরি। স্থানিকে আনুভুমিক বিকেন্দ্রিকরণ জরুরি। খাড়াখাড়ি ক্ষমতার বিন্যাস জরুরি। তবেই স্থানিক তাঁরস্বরে কথা কইয়ে উঠবে—সেই স্থানিক হোক না শেরপুর মুন্সিগঞ্জ কিংবা নওঁগা অথবা পাতরাইল কিংবা নাচোল।

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

টাউন শেরপুরে ব্যক্তির প্রযত্নে ছোটকাগজ—প্রয়াস (১৯৮৭), রবি রশ্মি (১৯৮৩), কবিতাপত্র (১৯৮৩), বিজ্ঞাপন পত্র (১৯৮৪), বৈশাখী(১৯৮৩), বিষন্ন সৈকতে ভোরের নোঙর (১৯৮৪), এই প্রান্তের সময় স্রোত ও অন্যান্য ১৯৯৯), রক্তের আল্পনা(১৯৮১), আড্ডা(১৯৯২), ময়ূখ( ১৯৯৬), সঞ্চরণ (১৯৯১), বর্ষাতি (১৯৯৭), সাহিত্যলোক (১৯৯৩), কনকাঞ্জলি (১৯৭৯), মন্বন্তর(১৯৮০), দৃষ্টি কথা বলবে (১৯৭৯), চতুরঙ্গ’ (১৯৭৬), ক (১৯৮৪), রক্ত মাংসের স্বর (১৯৮৩), সূর্করোজ্জ্বল নিজ দেশ (১৯৮৬), ক্ষয় (২০১০), সপ্তডিঙ্গা মধুকর (২০০২), রা (১৯৯৮)।

এই ছোটকাগজগুলো টাউন শেরপুরে সাহিত্যচর্চা চাতাল নির্মাণে সবিশেষ ভুমিকা পালন করেছে। হয়তো কয়েকটি কাগজ একাধিক আলোর মুখ দেখেনি, তবু সূচনা সংখ্যায় নিজের সরব উপস্থিতি জারি রেখেছে।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...