বুধবার, নভেম্বর ২৫সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

শেষ অধ্যায়ের আগে

1 0
Read Time:10 Minute, 0 Second
Jebunnahar Joni

শেষ অধ্যায়ের আগে

জেবুননাহার জনি

.

রায়হান এই প্রথম সিয়ামকে নিয়ে একা ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে। বাবা-ছেলে মিলে লাগেজ গোছগাছ করছে। সাত বছরের সিয়াম একটু পর পর দৌড়ে গিয়ে তার এক একটি ড্রেস আনছে আর বাবাকে দিয়ে বলছে, বাবা আমার এই ড্রেসটা নিয়ে নাও। আমার লাগবে।

রায়হানও সিয়ামের ড্রেসগুলো লাগেজে ভরে নিচ্ছে। এভাবে একসময় দেখা যায় সিয়ামের কাপড়েই লাগেজটি ভরে গেছে। নিজের কাপড় নেবার আর জায়গা নেই লাগেজটিতে।

রায়হান ভাবতে থাকে—কোথাও বেড়াতে গেলে সবসময় নিরুপমা কত সুন্দর করে সবার কাপড় গুছিয়ে লাগেজে ভরে নেয়। অথচ রায়হান এই সামান্য কাজটি করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

রায়হান হঠাৎ খেয়াল করলো সিয়াম খাটের উপরে আগোছালো কাপড় হাতে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর বিছানার চারিদিক দিয়ে ছড়ানো খেলনা, জুতো, জামাকাপড়। বেড়াতে যাবে চার-পাঁচ দিনের জন্য। আর ছেলে রাজ্যের জিনিস নেবার বায়না ধরে আছে।

ছেলেটা রাতে না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কাপড় গোছাতে গোছাতে রাতের রান্না করা হয়নি। রায়হান ভাবলো অনলাইনে খাবার অর্ডার করবে। কিন্তু সিয়াম বাইরের খাবার খেতে পারে না।

তাই সব রেখে নিজেই রান্না ঘরে গেল। তাড়াতাড়ি খিচুড়ি রান্না করে, আগের রান্না করা মুরগির মাংস ফ্রিজ থেকে বের করে সিয়ামকে খাইয়ে, নিজে খেয়ে শুয়ে পড়লো।

সকালে উঠেই সব গোছগাছ করে নেবে ভাবে। এর পর কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বের হবে বাবা-ছেলে। ভাবতেই বিশেষ এক আনন্দানুভব হয় রায়হানের।

শেষ অধ্যায়ের আগে

সিয়াম বাসের সামনের সিটে বসবে, তাই এক সপ্তাহ আগেই টিকেট কেটে রেখেছে রায়হান। সামনের সিটে বসতে পেরে সিয়ামের সেকি আনন্দ! সামনে থেকে রাস্তার পাশের যা কিছু দেখতে পাচ্ছে, তাই নিয়েই বাবাকে একটির একটি প্রশ্ন করছে।

সিয়ামের এত প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেছে রায়হান। কিন্তু সিয়ামের কোনো ক্লান্তি নেই। সিয়াম অনবরত একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। অবশেষে ছেলের প্রশ্নের জবাবে হু-হা করে পাস করে দিচ্ছে, আর ভাবছে—নিরুপমা কিভাবে এতগুলো বছর ছেলেকে ম্যানেজ করেছে?

বাসে বিরতিতে নেমে বাবা আর ছেলে রেস্টুরেন্টে ঢুকে ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে একটি টেবিলে নাস্তা খেতে বসে। এর পর সিয়ামকে খাওয়াতে খাওয়াতেই বিরতির সময় শেষ হয়ে যায়। বিরতিতে আর কিছু খাওয়ার সময় হয় না রায়হানের। কেক, চিপস আর কোক কিনে নিয়ে বাসে উঠে পড়ে তারা।

বাসে উঠেই কিছু পথ যেতেই সিয়াম ঘুমিয়ে পড়ে বাবার কোলে। রায়হান ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে—নিরুপমা কেমন করে সব ম্যানেজ করে নিতো?

রায়হানকে তো কখনো সংসার নিয়ে, ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। নাকি রায়হানই ইচ্ছে করেই নিরুপমা আর সংসারের প্রতি অবহেলা করেছে? 

ইদানীং অবসর পেলেই রায়হানের মাথায় পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব ঘুরপাক খায়। নিজের দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে ছেলেকে।

শেষ অধ্যায়ের আগে

রাত বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। বাবা-ছেলে রাতের অন্ধকারে সি বিচে তাবুর নিচে চেয়ারে বসে আছে। সামনে একটি কেক আর নাইফ রেখে অপেক্ষা করছে বারোটা বাজার জন্য।

সিয়াম তার বাবাকে প্রশ্ন করে, মাকে আমাদের সাথে আনলে না কেন? ছেলের এমন প্রশ্নের জবাবে কি বলবে রায়হান ঠিক বুঝতে পারে না। সিয়াম আবার বলে, বুঝতে পেরেছি। মা জার্নি করার সময় বমি করে তাই মাকে সাথে করে নিয়ে আসোনি, তাই না বাবা?

রায়হান আস্তে করে বলে, হু বাবা।

সিয়াম আবার বলে, তবু বাবা, আমার জন্মদিন বলে কথা। মাকে না হয় নিয়েই আসতে… মাকে খুব মনে পড়ছে। বলতে বলতে সিয়ামের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। রাতে পূর্ণিমার আলোয় স্পষ্ট বোঝা যায়—সিয়ামের চোখগুলো ছলছল করছে। ছোট্ট সিয়ামের বুকভাঙ্গা-কষ্টে রায়হানের চোখও লাল হয়ে উঠেছে।

শেষ অধ্যায়ের আগে

সিয়ামের জ্বর বেড়েই চলেছে। জ্বরের ঘোরে বারবার মাকে ডাকছে। এত রাতে কি করবে ভেবে পায় না রায়হান। মোবাইলটা হাতে নিয়ে একবার ভাবে নিরুপমাকে ফোন দিয়ে বলবে। আবার ভাবে এত রাতে নিরুপমাকে ফোন দেয়া ঠিক হবে না। ওর হাজবেন্ড রিয়েক্ট করতে পারে।

যে অধিকার সে নিজেই হারিয়েছে—কোন মুখে নিরুপমার সাথে কথা বলবে? কিছু ভেবে না-পেয়ে বাথরুম থেকে মগ ভর্তি পানি এনে তাতে রুমাল ভিজিয়ে মাথায় পানি পট্রি দিতে থাকে।

জ্বরের তাপ রুমালে লেগে মগের পানিও গরম হয়ে যায়। রায়হান বারবার পানি পাল্টে সিয়ামের মাথায় পানি পট্রি দেয়।

ভোরে একটু একটু আলো ফুটতে থাকে আকাশে। সিয়ামের কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বরের তাপ অনেকটা কমেছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে রায়হান।

এর পর বিছানা থেকে উঠে লাগেজ খুলে। হুইস্কির বোতলটা বের করে ফ্রিজ থেকে আইস নিয়ে আরেকটা গ্লাস নিয়ে বেলকনিতে ইজি চেয়ারে বসে। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ঠাণ্ডা বাতাসে রায়হানের একটু একটু শীত শীত লাগতে শুরু করে।

মনে পড়ে, নিরুপমা আর রায়হান তাদের বিয়ে বার্ষিকীতে সবসময় কক্সবাজার আসতো। ছেলেটাও মায়ের মতো হয়েছে। বিশেষ দিন হলেই কক্সবাজার আসতে চায়।

নিরুপমাকে নিয়ে অনেকবার এসেছে কক্সবাজার। নিরুপমা রাতের সি বিচে হাঁটতে খুব পছন্দ করতো। কিন্তু রায়হান রেস্টহাউজে বসে ড্রিংক করতো।

একবার নিরুপমা অনেক জেদ ধরলো বিচে হাঁটতে যাবে দুজনে। কিন্তু রায়হান ড্রিংক করতে বসে গেল। তখন নিরুপমা রাগ করে একাই বিচে হাঁটতে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পরে নিরুপমা রায়হানকে এক‌টি ম্যাসেজ লিখে পাঠায়। রায়হানের মনে পড়ে, ম্যাসেজটি হয়তো আজও মোবাইলে আছে। রায়হান মোবাইল অন করে খুঁজতে থাকে নিরুপমার ম্যাসেজটি।

অনেকক্ষণ খোঁজার পর নিরুপমার ম্যাসেজটি পাওয়া যায় :

খণ্ডিত আয়নায় প্রতিফলিত প্রেম

ভালোবাসার দিনগুলি ডাকে সংগোপনে

তৃষ্ণিত হৃদয় পোড়ে পলকহীন দহনে…

বেদনার নীল ভ্রমর হয়ে

একটু উষ্ণতার জন্য হিম শীতে ভিজে,

ছুঁয়েছি এক আগ্নেয়গীরির লাভা…

রায়হানের চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। মনে হয় সমুদ্রের ঢেউ থেকে বেরিয়ে নিরুপমা তার দিকে হেঁটে হেঁটে আসছে। তখন নিরুপমাকে অপরূপ অপ্সরী মনে হচ্ছে।

রায়হান অজান্তেই একাকী বিড়বিড় করে বলতে থাকে :

নিরুপমা, তোমাকে আর পাবো না জেনেও, কেন পাবার আকুতি জাগে মনে? আর দেখা হবে না জেনেও, মন অপেক্ষায় থাকে? হাত ধরে আর হাঁটা হবে না জেনেও, স্মৃতিতে অমলিন পথ চলে—বিরহে কাঁধে কাঁধ রেখে? চোখের জলে আঁকিবুকি না-হলেও, মনে মন বাঁধা থাকে সারাক্ষণ? জীবন এমন কেন? সুখের চেয়ে, দুঃখই বেশি দেয়..? কথাগুলো বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে রায়হান। মনে হয়, নিরুপমা অনেক কাছে চলে এসেছে অবিনশ্বর মুগ্ধতা নিয়ে। তার শরীর হিম হয়ে ওঠে, ইচ্ছে হয় কিছুটা পথ নিরুপমার সাথে হেঁটে—মোহময় আচ্ছন্নতার এই ঘোরকে আরো দীর্ঘায়িত করতে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleppy
Sleppy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *