shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শোনো, বলি হরিদাস

I say Haridas

শোনো, বলি হরিদাস

সুনীল শর্মাচার্য

শোনো, বলি হরিদাস

শোনো, বলি হরিদাস,

প্রতিক্ষণ ভাবনা যায়, ভাবনা আসে,

মাঝে মাঝে অন্যরকম ভাবনা

……… ……… ……… আরেকরকম হয়…

তাতে কি যায় আসে?

উঠা, বসা, ভাঙাগড়া নিত্য চলে…

হরিদাস, তুমিও জানো—

……… ……… ……… সব শূন্য এ ধরাধাম…

ব্যথা ছাড়া জীবনে কিছুই পাওনি—

কত ধুলোবালি উড়ে গেছে বাতাসে

……… ……… ……… তার হিসাব তুমিও রাখোনি!

হরিদাস, দেখো, গাছের পাতা দোলে

……… ফিসফাস কথা শোনো আনাচে-কানাচে

পৃথিবী বড় জটিল—

চিরদিন ক্ষমতার দৌরাত্ম্য চলে!

.

শোনো, বলি হরিদাস,

দেখো, সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে হাওয়া

……… ……… সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে মাটি

……… ……… সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে নদী,

……… ……… পাহাড়, বনজঙ্গল, ফসলের মাঠ…

.

হরিদাস, কি অবাক হচ্ছো আজ?

……… ……… চারদিকে বিজ্ঞাপন উসকে দিচ্ছে রাগ

……… ……… লোভ বাড়ে, না-পাওয়ার ক্ষোভ বাড়ে…

সমাজও যেন এইসব চায়—

……… ……… বেনিয়া পুঁজি বানাবে দাস,

……… ……… দিনে দিনে তারই আহ্বান…

.

হরিদাস, চুপচাপ থাকো,

……… ……… চুপ থাকা আমাদের ঐতিহ্য,

……… ……… খাও বা না-খাও, জপ রাম…

……… ……… ভাগ্যের দোহাই দিয়ে

……… ……… ঘরে বসে থাকো ঠুঁটো জগন্নাথ…

.

হরিদাস, এই পৃথিবী ধনীদের দাস—

……… ……… ক্ষমতার রসেবসে গরিবের বাঁশ!

.

শোনো, বলি হরিদাস, ফুরিয়ে এলো দিন

……… ……… ……… ফুরিয়ে এলো সময়,

……… ……… তবু তোমার কাজ থাকলো বাকি!

.

শীত গ্রীষ্ম পার হয়ে এলো বসন্ত দিন—

……… ……… ঝরে পড়ছে শুকনো পাতা,

……… ……… ঝরে পড়ছে কত রাত, কত শিশির

ঘাটে ঘাটে মাঝিদের আনাগোনা

……… ……… ……… ফুরিয়ে এলো তাদেরও দিন…

.

হরিদাস, চুপ হয়ে কি ভাবো এতো?

……… ……… শেষ ট্রেন চলে গেছে, স্টেশন ফাঁকা

……… ……… ……… আবার অপেক্ষায় যারা—

……… ……… তারাও তোমার মতো সামান্য পথিক!

.

হরিদাস, দেখো, শিব তলায় বসে এক অন্ধ বাউল

একতারায় গাইছে গান :

……… ……… ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো

……… ……… পার কর আমারে…’

.

গান শুনে তুমি মুচছো চোখের জল

ভাবছো : এ ভুবন বড় ছলনাময়

……… ……… এ ভুবনে বেঁচে থাকা চমৎকার…

কেউ রাজা, কেউ ফকির,

……… ……… সুখ নামক পাখিটা ধরতে তুমিও কাঙাল!

.

হরিদাস, চুপচাপ বসে আছো কেন?

……… ……… ……… উঠে পড়, উঠে পড় আজ—

……… ……… ঐ দেখ, নেমে গেছে জোয়ারের জল,

……… ভাটার টানে মাছ ধরে স্বপ্নের ধীবর!

.

শোনো, বলি হরিদাস, কেরানি জীবন কেটে গেল

……… ……… মহাজনের হিসাব রাখতে রাখতে

……… ……… ……… নিজের হিসেব আর রাখা হলো না!

সকাল থেকে সন্ধে কলম পিষে পিষে ক্লান্ত

……… ……… একমুঠো অন্ন জোটাতে হিমশিম…

.

ঋতুর গ্রাসে গাছের পাতা ঝরে, পাতা

হরিদাস, তোমারও রূপ ঝরে, তেজ ঝরে,       

জীবনের ঘানি টানতে টানতে তুমিও কলুর বলদ

.

প্রতিদিন সকালের রোদ মেখে কাজে যাও,

কাজ শেষে সন্ধ্যা গায়ে মেখে ঘরে ফেরো,

প্রতিদিন একই থোড় বড়ি খাড়া,

……… ……… ……… একই গল্প বারবার…

.

হরিদাস, কিছুই হলো না জীবনে!

……… ……… দিন চলে যায়, ত চলে যায়—

একটু সুখের খোঁজে যেতে চাও কোন অচিনপুরে

.

শোনো, লি হরিদাস,

দেখো, আকাশটা কেমন মুখ গোমড়া করে আছে,

……… ……… হাওয়া অফিস বার্তা দিয়েছে—

……… ……… যে কোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে…

.

দেশটা আর প্রকৃতি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে,

সময়ে কিছু হয় না, কেমন বীতশ্রদ্ধ পরিস্থিতি!

.

হরিদাস, দেখো, করোনায় চারদিক কেমন

……… ……… ……… থমথমে, হট্টগোল…

কারো কোনো হেল দোল নেই!

এরই মধ্যে রাজনৈতিক তরজা চলে,

……… ……… ……… কেন্দ্র-রাজ্য গোল গোল

সবাই দরদী, মর্মে মরে যায়…

.

হরিদাস, দেখো, বাজারে বাজারে—

……… ……… পেঁয়াজ-লঙ্কা, আলু-সবজি,

আনাজপাতি, মাংস-মাছ-ডিম দরদামে আগুন…

তার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ চলে,

……… ……… রাম-হনুমান হাততালি দেয়…

.

ঘৃণা ধরে গেছে…

……… ……… সাধারণ বলির পাঁঠা দেখি চিরকাল!

.

শোনো, বলি হরিদাস,

দেখো, আজকাল মধুও বিষ, ধানে বিষ,

……… ……… জলে বিষ, আনাজপাতিতে বিষ,

বিষ খেয়ে বেঁচে আছি আমরা নীলকণ্ঠ শিব!

নানা মতের রোদ বৃষ্টি দেখো,

দেখো, জোতজমি, গরুজোরু নিয়ে মগ্ন গৃহি!…

.

হরিদাস, দেখো, আশ্রমে সেবার চাদর বিছিয়ে

বসে সাধুবাবা; পূজোপাঠ করে, গঞ্জিকা সেবন করে;

……… ……… রোজ অন্ধভক্ত সিধে দেয়, রসে-বসে আহার,

আশ্রমে তাদের বহুগামী প্রবৃত্তি নিয়ে

……… ……… ……… কৃচ্ছ্রসাধন চলে…

সেখানে ধুনি জ্বলে, পুষ্পে পুষ্পে ঢাকা পড়ে

……… ……… ……… সকল ব্যভিচার!

.

হরিদাস, দেখো, এমনই ধর্ম-ধাম, আরো শোষণ

……… ……… ……… ……… ক্ষমতায় দড়…

গেরুয়া আড়ালে কেউ একঝাঁক গাভী পোষে,

কারো কপালে সিঁদুর, কেউ সাদা থানে

হৃদয়ের কাদা ঢাকে, কেউ কুমার, কেউ কুমারী

কত ত্যাগ, কত সাধনায় ব্রক্ষচারী—

ভাবলে, ধন্দে মাথা ঘুরে যায়…

.

হরিদাস, দেখো, ভক্তির রসে বাণিজ্য চলে

কেউ জার, কেউ রত্নাকর, যুগে যুগে—

জলের মতোই সোজা, এ-নিয়ম বড় মজারু…

.

শোনো, বলি হরিদাস, কতো হলো জানাজানি,

……… ……… কতো হলো ঘোরাঘুরি,

……… ……… এই শেষ হয়ে এলো দেশ

……… ……… এই নেমে এলো অসময়ে কালবেলা!

.

হরিদাস, কতো খেলা, কতো কথা মনে পড়ে

……… ……… ……… ……… তোমার,

কিছু মনে আছে, বেশি ভুলে গেছো। যেন কতো কালের গর্তেই ঢুকে গেছে                                                           

কতো কিছু…

.

হরিদাস, তুমি ভালো বন্ধুদের গুনে দেখো

……… ……… ……… এক দুই তিন…

.

এই পৃথিবীতে কিছু শেষ হয় না, সব শুরু হওয়া

সারা পৃথিবীতে যুদ্ধে হিরোশিমা, নাগাসাকি

……… ……… ……… ……… হলেও

মানুষ-পুরুষ বেঁচে থাকবে ছেলে বুড়ো,

মানুষ-মেয়ে সন্তান কোলে নিয়ে খাওয়াবে দুধ!

.

শোনো, বলি হরিদাস, এই আশা নিয়ে দিন শেষে

……… ……… ……… সবাই হেঁটে ফেরে ঘরে,

……… ……… ……… চলা থামে, চলা শুরু করে,

গান থেমে গেলে, গান শুরু করে প্রকৃতির নিয়মে!

.

শোনো, বলি হরিদাস, বেলা চলে যায়,

বসে বসে ভেবে নেই উপায়! তার থেকে

চলো, চলো, পথ হেঁটে যাই…

.

দেখো, পৃথিবীতে যারা চালাক,

……… ……… তারা গুছিয়ে নেয় সবকিছু,

তারা সব হিসাব কষে কষে পা ফেলে,

ভোগ-বিলাসে জীবন কাটায়—

আমরা অবোধ, বোকাসোকা, সরল

সাদামাটা জীবন নিয়ে বড় সংশয়…

.

চলো, চলো, উঠে পড়, উঠে পড়, দেখি—

এই পৃথিবীতে, এই নিত্য, এই অনিত্য সংসারে

আজ যা আছে, কাল তা নেই, এমনি সব…

.

শোনো, বলি হরিদাস,

পৃথিবীতে জয় আছে, পরাজয় আছে,

আছে মৃত্যু, আছে জরা, আছে নিত্য আসা-যাওয়া

সবই কালের চক্রে বাঁধা তুমি আর আমি!

.

শোনো, বলি হরিদাস, দেখো—

সব জায়গায় মার খাচ্ছি :

কেউ রক্ষা করছে না,

সবাই তাচ্ছিল্য করছে!

.

তুমি তো বলো :

পথে চলতে গেলে

এরকম একটু-আধটু ঘটনা ঘটে,

পা টলতে পারে, বুক কাঁপতে পারে,

অজানা-অচেনা হলে এসব হয়…

.

হরিদাস, আজ দেখছি, পায়ের তলায় মাটি নেই

জানতেও বাকি নেই স্বাধীনতা

সে-ও শাসনের বেড়িজালে ফাঁসি!

.

কাকে দোষ দেবো বলো,

কাকে বলবো, কার কারণে এই পরিণতি!

.

দেখো, শোনো, চারদিকে গুনগুন :

কেউ শিস দিচ্ছে

কেউ থুতু ফেলছে

কেউ বলছে : ভীরু কাপুরুষ!

.

চলো, চলো, হরিদাস, এসো,

অবহেলায় ফুঁসে উঠি—

আর খাবো না মার! এবার রাস্তা খুঁজি!

.

১০

শোনো, বলি হরিদাস,

ফিরে এসো, নিজের ভেতরে ফিরে এসো!

ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ো,

এই বেলা,

এখনো রোদ্দুর আছে

এখনো উত্তাপ আছে দিকচক্রবালে

এখনো ফিরতে পারো পথ ধরে ধরে!

.

শোনো, বলি, হরিদাস,

পৃথিবীটা বুড়ি হয়ে গেছে,

অসুস্থ বড়ই,

ইদানীং জরা ব্যাধি ক্ষয় মৃত্যু নিয়ে

সকলেই ব্যস্ত খুব,

মর্গের দরজা খুলে রেখে

ডোমগুলো ঢোলক পেটায়,

শূন্য প্রান্তর খাঁ খাঁ করে,

শকুনেরা ডানা দিয়ে রোদ আটকায়;

চারদিকে শেয়ালেরা ছুটোছুটি করে,

মাঝরাতে হাত নেড়ে নেড়ে

মালগাড়ি খানাখন্দ ব্রিজ পার হয়!

.

হরিদাস, আর কতোক্ষণ

বাইরে কাটাবে?

আর কতোক্ষণ

ঘোড়ার খুরের শব্দে জীবন মেলাবে?

ফিরে এসো ঘরে,

ফিরে এসো ঘরের ভেতরে!

…………………

পড়ুন

কবিতা

সুনীল শর্মাচার্যের একগুচ্ছ কবিতা

সুনীল শর্মাচার্যের ক্ষুধাগুচ্ছ

লকডাউনগুচ্ছ : সুনীল শর্মাচার্য

সুনীল শর্মাচার্যের গ্রাম্য স্মৃতি

নিহিত মর্মকথা : সুনীল শর্মাচার্য

প্রয়াণগাথা : সুনীল শর্মাচার্য

সুনীল শর্মাচার্যের কবিতাগুচ্ছ

অন্যভুবনের কবিতা

ঘোড়া : সুনীল শর্মাচার্য

মুহূর্তের কবিতা

অনুভূতি বেজে ওঠে

আমার কবিতা

সনেটগুচ্ছ

সুনীল শর্মাচার্যের সনেটগুচ্ছ

ভারতীয় লিমেরিক

সনেট পঞ্চ

সুনীল শর্মাচার্যের বারোটি কবিতা

বন্ধু-বান্ধবীর জন্য একগুচ্ছ কবিতা

শোনো, বলি হরিদাস

মুক্তপদ্য

ভারতীয় কোলাজ

ইচিং বিচিং পদ্য : সুনীল শর্মাচার্য

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...