রবিবার, মে ৯সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

সামনে এগোলেই তুমি

1 0
Read Time:6 Minute, 38 Second
You go ahead

সামনে এগোলেই তুমি

জেবুননাহার জনি

সামনে এগোলেই তুমি

একটুকরো মাঠ পেরোলেই ঝিল। এই ঝিলের ধারে রুমকি মাঝে মাঝেই এসে বসে থাকে। রুমকির বাসা থেকে ঝিলের দুরত্ব খুব বেশি না। আজ রুমকির মনটা খুব খারাপ। আজ তার প্রিয় শিল্পী লতা মঙ্গেশকর মারা গেছেন।

রুমকি কত রাতদিন যে পার করেছে লতা মঙ্গেশকরের গান শুনে তার কোনো হিসেব নেই। তাঁর কণ্ঠে কী এক জাদু আছে!

একবার শিপন রুমকিকে একটি গানের সিডি করে দিয়েছিল। বলেছিল, গানের কথাগুলো শুনবে। রুমকি রাতে সিডিটি ল্যাপটপে অন করে গান শোনার জন্য। কী মিষ্টি গানের কণ্ঠ বেজে ওঠে : ‘লা লা লা লা লা… লা লা লা লা লা… আকাশের সূর্য আছে যতদিন, তুমি তো আমারই আর কারো নও…’—গানের কথাগুলো অনেক সুন্দর।

গানটি শোনার পরে রুমকি পরের গানটি শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু পরের বারও লতার একই গান বাজলো এবং যতবারই পরের বার নতুন কোনো গান শোনার অপেক্ষা করলো, ততবারই একই গান বেজে চলল।

রুমকি তখন বুঝলো এটা শিপনের এক ধরনের পাগলামি। শিপনের এমন অনেক পাগলামি আছে নোট করার মতো।

শিপন রুমকিদের এলাকাতেই থাকে। রুমকিকে শিপন পছন্দ করে—এটা তাদের পুরো মহল্লাবাসী জানে। কিন্তু রুমকি কখনো শিপনকে প্রেমিক হিসেবে মানতে পারেনি।

শিপনের অনেক পাগলামি করার পরে যখন রুমকি বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয়, সম্পর্কের গভীরে যাবার কথা ভাবে। তখন রুমকি সে-কথা তার পরিবারকে জানায়। যেখানে তার বিয়ের কথা হয়েছে, তা ভেঙ্গে দেবার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তখন শিপনই পিএইচডি করতে দেশের বাইরে চলে গেল।

শিপন যাবার সময় রুমকিকে বলেছিল, ফিরে এসেই তারা বিয়ে করবে। এর পর অনেকদিন অপেক্ষায় থাকার পরে রুমকি যখন শিপনের কোনো খবর না-পেয়ে বিষন্ন হয়ে গিয়েছিল, তখন জানতে পারলো—শিপন যে দেশে গেছে, সেখানে এক মেয়েকে বিয়ে করেছে।

এর পরে রুমকির কাছে ভালোবাসার অর্থ পাল্টে যায়। রুমকির জীবনে অনেকে প্রেম-ভালোবাসার কথা বললেও, এখন আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।

শিপনের স্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে এলাকার বাইরে কোথাও চাকরির চেষ্টা করছিল রুমকি। চাকরিও হয়েছে, একটি গ্রামে—এনজিওতে। গ্রামটি অনেক সুন্দর।

রুমকি যেখানে থাকে। মেঠো পথ ধরে হেঁটে চললে, দুই পাশে গাছ আর সবুজ মিলেমিশে তৈরি করে অন্য এক সমীকরণ। এইসব সবুজের টানে আর মাটির মিষ্টি গন্ধে প্রাণ ভরে ওঠে।

বেশ ভালো লাগে রুমকির এই সবুজে ঘেরা গ্রামটি। তার বাবা-মা তাকে কত অনুরোধ করেছে, চাকরি ছেড়ে ঢাকার বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য। কিন্তু রুমকি এই গ্রামের প্রেমে পড়ে গেছে।

গ্রামটা এত সুন্দর যে রুমকি এখানে না এলে, নিজের চোখে না-দেখলে জানতেই পারতো না।

সন্ধ্যার আকাশে আজ ঘন কালো মেঘ। যেন রাত্রির সব অন্ধকার জমে আছে ভারি হয়ে আকাশের বুকে। ঝিলের ঘাট বাঁধানো পাড়ে বসে আঁধারে জলের দৈর্ঘ্য মাপতে চেষ্টা করে রুমকি।

এমন সময় প্রিয় নীরবতা ভেঙে খুব চেনা এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে কানে। রুমকির নাম ধরে কেউ একজন ডাকছে। নিজের কানকে বিশ্বাস হয়নি। আবারো ‘রুমকি…’।

ঘুরে তাকাতেই শিপনকে দেখে খুব অবাক হয় রুমকি। শিপন কাছে এসে পাশে বসে। যেন কল্পনারই একাংশ। কারো মুখে কোনো কথা নেই।

কেমন আছো রুমকি? প্রশ্ন করে শিপন।

রুমকি : ভালো, তুমি?

শিপন : তোমার কাছেই তো, তুমি বলো।

রুমকি তখন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে, অপেক্ষায় ছিলাম।

শিপন আস্তে বলে, এখনো?

রুমকির কণ্ঠ কেমন যেন আটকে আসে। তবু চেষ্টা করে ধরা গলায় বলে, বুঝতে পারছি না। রুমকি আসলেও বুঝতে পারছে না। এটা কি সে স্বপ্ন দেখছে? নাকি সত্যিই শিপন তার সামনে?

‘অনেক রাত হয়েছে, এখন চলো। ঘরে গিয়ে বাকি কথা হবে।’—এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের একটি হাত এগিয়ে ধরে রুমকির দিকে। রুমকি শিপনের হাত ধরে উঠে দাঁড়ায়।

এর পরে দুজন একসাথে অন্ধকার পথ পেরিয়ে চলে।

হঠাৎ আকাশের কালো মেঘগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। শীতল বাতাসে রুমকির শরীর শিউরে ওঠে। এই মুহূর্তের মতো এত ভালো আগে কখনো লাগেনি রুমকির।

শিপন একটু সামনে থেকে বলে, কী হলো দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো অনেক রাত হয়েছে।

রুমকির মুখে পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছে। ঝিরঝিরি করে বৃষ্টি পড়ছে।

শিপন পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রুমকির মায়াবী মুখে।

দূর থেকে ভেসে আসে রাখালী বাঁশীর মাতাল সুর। আর সেই সুরে রাতের আঁধার যেন আরো ছন্দময় হয়ে উঠছে। আঁধারের আচ্ছন্নে রুমকি শিহরিত হাতে জোনাকি সরাতে সরাতে ধীর গতিতে এক-পা দু-পা করে এগোতে থাকে সামনের দিকে।

…………………

পড়ুন

জেবুননাহার জনির গল্প

স্বপ্নলোকের চাবি

শেষ অধ্যায়ের আগে

সামনে এগোলেই তুমি

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *