বুধবার, নভেম্বর ২৫সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ

1 0
Read Time:8 Minute, 42 Second
Soumitra Chattopadhyay

সত্যজিত রায়ের অপু ও ফেলুদা চরিত্রের অমর শিল্পী, অভিনেতা, আবৃত্তিকার, কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়; তাঁর প্রয়াণ হলো আজ। ভারতীয় সময় ১২টা ১৫ মিনিটে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে হাসপাতালে তাঁর ৪১ দিনের যুদ্ধ শেষ হলো। হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা যায়, কোভিড এনসেফ্যালোপ্যাথির কারণেই সবরকম চিকিত্‍সার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।

অনেকের বিচারে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই অভিনেতার মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। প্রথমত, তিনি ছিলেন অভিনেতা। কবিতাচর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন—তাঁর বিপুল বৈচিত্র্যের একেকটি দিক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সবকিছু নিয়েই অনন্য।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এমনই এক শিল্পী, যাঁর মূল্যায়ন নিয়ে কোনো পণ্ডিতি-তর্ক তোলার অবকাশ রাখে না। বলা হতো সময়ের ধুলা তাঁর আভিজাত্যের সৌন্দর্য স্পর্শ করতে পারে না।

গত ১ অক্টোবর থেকে বাড়িতে থাকাকালীন তাঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন। তবে করোনার কোনো উপসর্গ পাওয়া যায়নি। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হলে ৫ অক্টোবর তাঁর কোভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট আসে।

৬ অক্টোবর তাঁকে ভর্তি করানো হয় বেলভিউ নার্সিং হোমে। এখানে সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর তাঁর করোনার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। এর পরই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুস্থ হতে থাকেন। চিকিৎসা চলছিল।

হঠাৎ করে ২৪ অক্টোবর রাত থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। এর পর ধীরে ধীরে তিনি চেতনাহীন হয়ে পড়েন। তাঁকে সুস্থ করার জন্য গত বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর ২০২০) প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়।

এর আগে বুধবার (১১ নভেম্বর ২০২০) কিডনির ডায়ালাইসিস করা হয়। শুক্রবার (১৩ নভেম্বর ২০২০) বিকেলে তাঁর হৃদস্পন্দন হঠাৎ করে বেড়ে যায়, রাতে চেতনা স্তর ৫-এ নেমে যায়।

তাঁর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ১৬ সদস্যের চিকিৎসা দলের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ফুসফুসে আরো বেশি করে অক্সিজেন পৌঁছানোর জন্য গতকাল শনিবার (১৪ নভেম্বর ২০২০) বাড়ানো হয়েছিল অক্সিজেনের মাত্রা।

এ সময় তাঁর চিকিৎসা দলের প্রধান অরিন্দম কর জানিয়েছিলেন, এই চেতনা স্তর ৩-এ নেমে গেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্রেন ডেথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁকে বিভিন্ন ধরনের লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

অরিন্দম আরো বলেন, মনে হচ্ছে, তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমাদের ৪১ দিনের লড়াই যথেষ্ট নয়। আপাতত আমাদের নতুন কিছু বলার নেই। তিনি যেন ভালো হয়ে ওঠেন, সবাইকে সেই প্রার্থনা করতে হবে।

চিকিৎসকেরা প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও, অবস্থার আরো অবনতি হতে থাকে।

আজ রোববার (১৫ নভেম্বর ২০২০) তাঁকে দেওয়া হয়েছিল শতভাগ ভেন্টিলেশন সাপোর্ট। রক্তচাপ, হার্টবিট, হার্ট রেট স্বাভাবিক করার জন্য যা যা ওষুধ দরকার, সব দেওয়া হয়।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুতেই চিকিৎসায় তিনি সাড়া দেননি। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, তিনি বিদায় নেন প্রকৃতির নিয়মে।

একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

১৯৩৫ সালে ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় একজন আইনজীবী ও মঞ্চঅভিনেতা। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায়ও যুক্ত ছিলেন মঞ্চনাটকে। তিনি স্থানীয় নাটকের দল ‘প্রতিকৃতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

জীবনের প্রথম ১০ বছর কৃষ্ণনগরে কাটিয়েছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দাদার নাটকের দল ছিল। বাড়িতে নাট্যচর্চার পরিবেশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই নাটকে অভিনয় শুরু করেন।

কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন।

কলেজের ফাইনাল ইয়ারে হঠাৎ একদিন মঞ্চে শিশির ভাদুড়ীর নাটক দেখার সুযোগ হয় তাঁর। সেদিনই জীবনের মোড় ঘুরে যায় তাঁর। তিনি পুরোদস্তুর নাটকে মনোনিবেশ করেন।

শিশির ভাদুড়ীকে গুরু মানতেন। বলেছেন, অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব ছিল তাঁদের। সবরকম আলোচনা হতো দুজনের।

বাংলা সিনেমাজগতের আরেক কিংবদন্তি ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে সৌমিত্রকে পরিচয় করিয়ে দেন সত্যজিৎ রায় নিজেই। সিনেমার জগতে হাতেখড়ি হয় তাঁর সে সময়।

‘অপুর সংসার’-এ অপু হন তিনি। প্রথম ছবিতেই আলোচনায় এসেছিলেন। জানা যায়, সে ছবির শুটিংয়ে প্রথম দিনের ফার্স্ট শটেই সিন ওকে।

পরে একে একে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেবী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘চারুলতা’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’সহ বহু ছবি করেছেন তিনি।

সত্যজিৎ রায়ের কমপক্ষে ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র। সত্যজিতের সৃষ্টি ‘ফেলুদা’কে বড় পর্দায় জীবন্ত করেছিলেন তিনিই।

ফেলুদা পরে বহুবার হয়েছে ছোট ও বড় পর্দায়। কিন্তু যে কোনো বাঙালি একবাক্যে স্বীকার করবেন যে সৌমিত্রর মতো ফেলুদা আর কেউ নন।

তাঁ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র : ‘অশনিসংকেত’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘দেবদাস’, ‘নৌকাডুবি’, ‘গণদেবতা’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘আতঙ্ক’, ‘গণশত্রু’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘তিন কন্যা’, ‘আগুন’, ‘শাস্তি’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ প্রভৃতি।

অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০৪ সালে তাঁকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকে-সহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন দীপা চট্টোপাধ্যায়কে। তিনিও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িয়ে আছেন। তাঁদের এক ছেলে সৌগত চট্টোপাধ্যায় একজন কবি; এক মেয়ে পৌলমী সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত। পৌলমী বসুর ছেলে রণদীপ বসু টালিগঞ্জের উদীয়মান অভিনেতাদের একজন।

—ডেস্ক শুভ বিনোদন

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleppy
Sleppy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *