shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

স্বপ্নলোকের চাবি

The key to the dream world
The key to the dream world

স্বপ্নলোকের চাবি

জেবুননাহার জনি

স্বপ্নলোকের চাবি

বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে মিলন হামিদ। ‘মিলন হামিদ’ বিখ্যাত অভিনেতা। একসময় তাঁর পারিশ্রমিক ছাপিয়ে যেত সকল অভিনেতাকে। সময়ের বিবর্তনে বার্ধক্য ও অসুস্থতাজনিত কারণে দীর্ঘদিন রোগে ভুগে আজ তাঁর স্থান হাসপাতালের কেবিনে।

সারাদিন শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে কার ভালো লাগে? এ ধরনের চিত্রে সে বহুবার অভিনয় করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রেও একসময় তাকে এই রোল প্লে করতে হবে সে ভাবেনি।

মিলন সাহেব আপনার ওষুধ নেবার সময় হয়েছে, বলেই তাঁর রুমে সাদা পোশাক পড়া একজন নার্স ঢোকে। মিলনের রুমে টিভিতে গানের প্রোগ্রামে গান গাইছে স্বপ্না। এ বয়সেও তাঁর গানের কি গলা! তাঁর গান শুনে মিলন মুগ্ধ।

মিলন ফিরে যায় তাঁর পঁচিশ বছর আগের জীবনে। ভাবে সেদিনই তো, সন্ধ্যাকালীন এক গানের অনুষ্ঠানে মিলন ছিল অতিথি। সেদিন স্বপ্না একের পরে এক গান গাইছিল। আর দর্শক সারি থেকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল, ওয়ান মোর—ওয়ান মোর করে।

মিলনও সেদিন ক্লান্তিহীন, মুগ্ধ হয়ে গান শুনেছিল। শুধু গানেই নয়—স্বপ্না দেখতেও বেশ সুন্দরী, তাই প্রথমদিন দেখাতেই স্বপ্নার প্রেমে পড়েছিল মিলন। অনুষ্ঠান শেষে কেউ একজন স্বপ্নাকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেবার অনুরোধ করে মিলনকে। মেঘ না চাইতে বৃষ্টি, এমনই মনে হয়ে ছিল তাঁর সেদিন।

এর পর স্বপ্নাকে সে বাড়ি পৌঁছে দেয়। স্বপ্না তাকে গাড়ি থেকে নেমে এক কাপ চা পান করার জন্য জোড় করে। কিন্তু মিলন আরেকদিন আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিন বিদায় নেয়।

এর পর নানা ব্যস্ততায় কেটে যায় বহুদিন। স্বপ্নার বাসায় আর যাওয়া হয় না। এক আর্টিস্ট তাকে জানায় স্বপ্নার বিয়ে ঠিক হয়েছে। কথাটা শুনে, হঠাৎ মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে মিলনের। মিলন কি করবে ভেবে পায় না। স্বপ্নার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পারে না।

মিলনের চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে। শেষে সাতপাঁচ না-ভেবে হাজির হয় স্বপ্নাদের বাড়িতে। মিলনকে দেখে স্বপ্না ভূত দেখার মতন চমকে যায়। মিলনের মনের কথা শুনে আরো অবাক হয় স্বপ্না। 

কিন্তু স্বপ্নার মুখে কোনো কথা নেই। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে জানায়, এখন আর সময় নেই। কিন্তু মিলন নাছোড়বান্দা, সে স্বপ্নার মতামত জানতে চায়। সে মিলনকে চায় কি-না?

স্বপ্নলোকের চাবি

অবশেষে সম্মতি পেয়ে সেদিন চলে আসে মিলন। কিন্তু পরের দিন আবারো হাজির হয় স্বপ্নাদের বাড়ি। তবে আজ সে একা নয়। বাড়ির লোকজন নিয়ে। স্বপ্নার বাবা একজন অভিনেতার সাথে তাঁর মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে অবশেষে তাকে রাজি করাতে সক্ষম হয়। এর পর মিলন আর স্বপ্নার বিয়ে হয়।

এর পর একে একে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। তাদের ঘরে আসে দুটি সন্তান। পলক ও তন্ময়। এতগুলো বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে তাদের জীবনে, কিন্তু তাদের ভালোবাসায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

আজও স্বপ্নাকে তাঁর কাছে একই রকম মনে হয়। দিন দিন যেন স্বপ্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসা পুড়ে পুড়ে আরো খাঁটি হয়েছে। নানা অভাবে স্বপ্নাকেও কখনো সে অভিযোগ করতে দেখেনি। স্বপ্নার ফর্সা মুখ কালো হয়ে ভার হতে দেখেছে, তবু মুখে কিছু বলেনি।

স্বপ্নার অনুযোগ মিলন ঠিক বুঝত। কিন্তু মিলনও অসহায় ছিল সংসারে। সারাজীবন সততা নিয়ে আর শিল্পচর্চা করে জীবন পার করেছে। আর আজ তো সংসার চালাতে পুরোপুরি অক্ষম। এই অক্ষমতাকেও স্বপ্না মেনে নিয়ে মিলনের সাথে জীবনসঙ্গী হয়ে সংসারের সব ভার তাঁর নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

এমন কি আজও মিলনের ওষুধ আর হাসপাতালের বকেয়া মেটানোর জন্যই ১০২ জ্বর নিয়েও এই গানের অনুষ্ঠানটি করছে। স্বপ্নার প্রতি এই কৃতজ্ঞতা মিলন কি করে প্রকাশ করবে খুঁজে পায় না। শুধু বুকের ভেতরটা তাঁর ছটফট করতে থাকে। তাঁর মনে হয়, কখন স্বপ্না কাছে আসবে? স্বপ্নাকে বুকে আঁকড়ে ধরে বুকের যন্ত্রণা কিছুটা হয়তো কমবে।

টিভির প্রোগ্রামে একের পর এক গান গেয়ে যাচ্ছে স্বপ্না। ‘কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নলোকের চাবি…’—এমন সময় এক নার্স মিলনকে ওষুধ দিতে এলো। এর পর চলে যাবার সময় নার্সটি বলল, ‘ইনি আপনার স্ত্রী না? অসুস্থ স্বামী হাসপাতালে পড়ে আছে আর তিনি গেছে টিভিতে গান গাইছে। কি জামানা যে পরছে’ বলতে বলতে নার্সটি চলে যায়।   

মিলনের খুব বলতে ইচ্ছে হয়—কিছু বলতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু পারে না। দু’চোখ বেয়ে পানি নেমে আসে। এর পর ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে।

…………………

পড়ুন

ছোটগল্প

শেষ অধ্যায়ের আগে : জেবুননাহার জনি

স্বপ্নলোকের চাবি : জেবুননাহার জনি

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...