রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

0 0
Read Time:9 Minute, 56 Second
heart disease

ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। দেশে প্রতিবছর হৃদরোগে যে মৃত্যু হয়—তার ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট।

ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের যে ১৫টি দেশের নাম প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, তার মধ্যে বাংলাদেশেও রয়েছে। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রচলিত ডালডায় খাদ্যে উচ্চমাত্রার চর্বি জাতীয় পদার্থ ট্রান্স-ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট সবচেয়ে বেশি পরিমাণে রয়েছে।

সম্প্রতি ডব্লিউএইচও ‘হু রিপোর্ট অন গ্লোবাল ট্রান্সফ্যাট অ্যালিমেনেশন ২০২০’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখান থেকে জানা যায়, বিশ্বে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটে ১৫টি দেশে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডালডায় ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ ট্রান্সফ্যাট থাকে। সাধারণত খরচ কমানোর জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, জিলিপি, চিকেন ফ্রাই-সহ বিভিন্ন ভাজা পোড়া খাবার তৈরির সময় এসব ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

এ ছাড়া কয়েক বছর আগে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন তাদের এক গবেষণার অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ১০টি বিস্কুট পরীক্ষা করে এগুলো মধ্যে ৫ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে—যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

ডব্লিউএইচওর ১৫টি দেশের তালিকায় থাকা—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাটভিয়া ও স্লোভেনিয়া ইতোমধ্যে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলে নীতি গ্রহণ করেছে।

এসব দেশ সম্প্রতি সব খাবারে প্রতি ১০০ গ্রাম ফ্যাটে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ পরিমাণ ২ গ্রামে সীমিত করেছে অথবা পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল পিএইচও’র উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

বাকি ১১টি দেশ বাংলাদেশ, ইরান, ভারত, মেক্সিকো, নেপাল, পাকিস্তান, কোরিয়া, মিশর, আজারবাইজান, ভুটান, ইকুয়েডরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ডব্লিউএইচও আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল এক অনুষ্ঠানে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, যখন গোটা বিশ্ব কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ে লড়াই করছে, এ অবস্থার মধ্যেও আমাদের অবশ্যই মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাটমুক্ত বিশ্ব অর্জনের যে লক্ষ্য রয়েছে, তাতে আমাদের কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না।

বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব ধরনের ফ্যাট, তেল এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ।

ট্রান্সফ্যাট খাদ্যে কিভাবে আসে?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছেন, তেল বারবার পোড়ালে তা থেকে অক্সিজেন চলে যায় ও তাতে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয় আর এ ধরণের তেল দিয়ে কোনো কিছু ভাজলে সেটি মচমচে হয়।

ডালডা, জিলাপি, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, পিয়াজি, বেগুনি, আলুচপ, নানা পদের বিস্কুট, চানাচুর, চিপসের মতো বেকারি পণ্যে বা ফাস্ট ফুড তৈরিতে এ ধরণের তেল বেশি ব্যবহার করা হয় মচমচে করার জন্য।

মূলত প্রাকৃতিক বা শিল্প উৎস থেকে আসা অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডই হলো ট্রান্সফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাটি এসিড।

দুধ, মাখন, ঘি, গরুর বা ছাগলের মাংস হলো প্রাকৃতিক ট্রান্স ফ্যাটের উৎস, অন্যদিকে শিল্পক্ষেত্রে উদ্ভিজ্জ তেলের হাইড্রোজেনেশনের সময় ট্রান্সফ্যাট উৎপন্ন হয়। এই হাইড্রোজেনেটেড তেলই শিল্পে উৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস।

এমনকি রান্নার কাজে এক তেল বারবার পোড়ালেও তাতে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হতে পারে।

আর ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তের খারাপ কোলেস্টরেল বাড়িয়ে দেয়, আর মাত্রা কমায় ভালো কোলেস্টরেলের। আর খারাপ কোলেস্টরেল রক্তবাহী ধমনীতে জমা হয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে—যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব বাংলাদেশের অবস্থা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর যত মানুষ মারা যায় তার ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী এই ট্রান্সফ্যাট। সংস্থাটি বাংলাদেশ-সহ ১১টি দেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটি ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ করছে এবং তারা বলছে সব ফ্যাট, তেল এবং খাবারে প্রতি একশ গ্রাম ফ্যাটে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই গ্রামে সীমিত করতে হবে। যদিও তাদের হিসেবে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে নীতিমালা না-থাকার কারণে ট্রান্সফ্যাট ঝুঁকিতে আছে।

বাংলাদেশে এখনো এ সম্পর্কিত কোনো নীতিমালা না-থাকলেও নানা সংস্থা এগুলো নিয়ে সচেতনতার কাজ শুরু করেছে।

বাংলাদেশে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা বলছে, ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পিএইচও (পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল) ব্র্যান্ডসমূহের নমুনার ৯২ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত দুই শতাংশ মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) পেয়েছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষকগণ।

গবেষণায় ঢাকার পিএইচও নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রতি ১০০ গ্রাম পিএইচও নমুনায় সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ৯ গ্রাম পর্যন্ত ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে—যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি।

তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা দুই শতাংশে নামিয়ে আনার জন্য একটি নীতিমালা তৈরিতে কাজ শুরু করেছে তারা।

প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব?

ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হিমেল সাহা বলছেন, ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগ থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র উপায় হলো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ। এর বাইরে আপাতত আর কোনো সমাধান নেই।

অন্যদিকে ডা, মুশতাক বলেন, মানুষকে সচেতন হতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম, প্রচুর পানি পান—এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে যেসব খাবার প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর তদারকির ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

—ডেস্ক শুভ স্বাস্থ্য

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleppy
Sleppy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *