shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

ভারতের CAA, NRC নিয়ে দু’চার কথা

Retail talk all around
How many problems I am in
খুচরো কথা চারপাশে

ভারতের CAA, NRC নিয়ে দু’চার কথা

সুনীল শর্মাচার্য

ভারতের CAA, NRC নিয়ে দু’চার কথা

ভারতের CAA, NRC নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় তোলপাড় হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ভারতের সংবিধান, গণতন্ত্র, সামাজিক সম্প্রীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা—সবই ভেঙেচুরে ধনতান্ত্রিক কায়দায় ভারতকে হিটলারের জার্মানি বানাতে চায়! CAA, NRC হচ্ছে তারই ক্ষতিকারক পদক্ষেপ।

CAA, NRC জিনিসটি কি? খায় না মাথায় মাখে? বিষয়টি পরিষ্কার করি আলোচনায় :

১. CA-১৯৫৫ হচ্ছে ভারতের অরিজিনাল নাগরিকত্ব আইন। এই আইনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিঃশর্তভাবে স্বীকৃত। একটি বাচ্চা ভারতে জন্মালে সে ভারতের নাগরিক। পিরিয়ড। ভারতের আকাশে উড়ন্ত এরোপ্লেনে বা ভারতের সাগরে ভাসমান জাহাজ বা স্টিমারে জন্ম নিলেও নাগরিক।

এ ছাড়া নাগরিকত্ব পাওয়ার অন্যান্য উপায়ও স্বীকৃত। যথা আদি বসবাস সূত্রে। যথা উত্তরাধিকার সূত্রে। বোঝাই যাচ্ছে যে, এই আইন অতীতে অবিভক্ত ভারতের অধিবাসী ও বর্তমানে ভারতের অধিবাসী উদ্বাস্তুদের ও তাঁদের সন্তানদের স্বার্থ রক্ষা করে।

২. উদ্বাস্তুদের অধিকার একে একে হরণ করে নিচ্ছে নাগরিকত্ব আইনের ওপর আনা সংশোধনীগুলো—CAA 1986, CAA 2003 ও CAA 2019। প্রথম দুটি CAA ধাপে ধাপে কেড়ে নেয় জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিঃশর্ত অধিকার। শুধু জন্মালেই হবে না, বাবা ও মায়ের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে, এ সরাসরি উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তানদের ওপর আঘাত।

২০০৩ সালের আইন দিয়ে তখনকার বিজেপি সরকার বাঙালি উদ্বাস্তুর চরম সর্বনাশ করে। এই আইনে বাঙালি উদ্বাস্তুদের বাঁশ দেওয়ার জন্য ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার ‘বেআইনি অভিবাসী’ (illegal immigrant) শব্দ আমদানি করে তার আইনি সংজ্ঞা তৈরি করে CAA 2003।

এই আইনের ২.১ (বি) ধারায় বলা হয় যে কোনো মানুষ যার ভারতবর্ষে আসার সময় বৈধ পাসপোর্ট ছিল না—যা যিনি বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে গেছেন, এমন মানুষদের অনেক বছর পরেও দুম করে অনুপ্রবেশকারী বানিয়ে দেওয়া যায়। তাঁদের এদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানদের নাগরিকত্ব নিমেষে খারিজ করে দেওয়া যায়।

বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই যে, এই আইন উদ্বাস্তুদের পিঠে কীভাবে ছুরি মেরেছে? বন্যা, খরা, দারিদ্র, হিংসা, দেশভাগ, দাঙ্গা থেকে বাঁচতে এদেশে চলে আসা উদ্বাস্তুদের পক্ষে কি আদৌ পাসপোর্ট ভিসা নিয়ে আসা সম্ভব? এদের অধিকাংশই তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। মতুয়া, রাজবংশী ছাড়াও অন্যান্যরাও আছেন।

৩. CAA 2003 আরো দুটো কারণে উদ্বাস্তুদের জন্য চরম ক্ষতিকারক। এই আইনে ৩(সি) ধারায় কী বলা হয়? CAA 1986 পর্যন্ত বলা ছিল যে, যারা ভারতে জন্মেছেন তাদের মা-বাবার মধ্যে অন্তত একজন নাগরিক হলেই তিনি জন্মসূত্রে নাগরিক হবেন।

কিন্তু এবার আরো একধাপ বাঁশ দিয়ে উদ্বাস্তুদের বলা হলো যে, বাবা-মা দুজনের কেউই উপরের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘বেআইনি অভিবাসী’ নয়, একমাত্র তবেই ভারতে জন্মানো শিশুকে নাগরিক মানা হবে!

এর ফলে আরো বহু উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান, যারা এদেশের জন্মসূত্রে নাগরিক হওয়ার কথা, তাদেরও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হলো।

৪. CAA 2003 আরো কেন ক্ষতিকারক? কারণ এই আইনের ১৪(এ) ধারায় এনআরসি, এনপিআর আর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফাঁদ পাতা হলো ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার। এই ধারা যতক্ষণ না বাতিল হবে ততক্ষণ ভারত রাষ্ট যে কোনো সময়ে NPR, NRC করতে পারে।

NPR, NRC করলে উদ্বাস্তুদের পেছনে কত বড় বাঁশ হবে সেটা আসামের ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে এবং দেশের প্রতিটা উদ্বাস্তু পরিবার এ কথা হাড়ে হাড়ে জানে। নিশ্চয়ই এই পয়েন্টটা আর বুঝিয়ে বলতে হবে না!

৫. CAA 2019 উদ্বাস্তুদের জন্য এনে হাজির করেছে নতুন বাঁশ। CAA 1986 ও CAA 2003-এ উদ্বাস্তুদের যে যে বাঁশ দেওয়া হয়েছে—সেইসব বাঁশ এই আইনে বাতিল করা হয়নি। উল্টে পাতা হয়েছে উদ্বাস্তু শিকার ও উদ্বাস্তু বিতাড়নের এমন এক ইঁদুরকল যাতে ‘পরিচয়পত্র’ পাওয়ার লোভে উদ্বাস্তুরা নিজেই নিজেদের ‘বেআইনি অভিবাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

অর্থাৎ, যে উদ্বাস্তু এই দেশে ভোটার, আধার, পাসপোর্ট, প্যান ইত্যাদি সমস্ত পরিচয়পত্র নিয়ে করেকম্মে খাচ্ছিলেন, তিনি CAA 2019-এর টোপে পড়ে প্রথমেই লিখে দেবেন তিনি বে-আইনি। এর পর তিনি সরকার বাহাদুরের কাছে ভিক্ষা করবেন একটি আইনি স্বীকৃতি।

তখন (সরকারের জেপিসি রিপোর্ট অনুযায়ী) তাঁদের আবেদন বিচার করবে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং RAW! তারা প্রমাণ চাইবে ধর্মের, প্রমাণ চাইবে এদেশে আসার কারণের! সন্তুষ্ট হলে নাগরিক। প্রমাণ দিতে না-পারলে আর ফিরিবার পথ নাহি।

কারণ আপনি ততক্ষণে নিজের ডিক্লেরেশনে অনুযায়ী ‘বেআইনি অভিবাসী’ এবং এ যাবতকাল জাল পরিচয়পত্র রাখার জন্য ভারতের দণ্ডবিধি অনুযায়ী জেলে বসত নিশ্চিন্ত। কে কে উদ্বাস্তু আছেন হাত তুলুন, যে এই পরীক্ষায় বসতে রাজি?

৬. ভারত সরকারের দেওয়া জেপিসি রিপোর্ট ২০১৯ অনুসারে শুধুমাত্র সারাদেশ মিলিয়ে মোট ৩১,৩১৩ জন মানুষ (২৫,৪৪৭ হিন্দু, ৫৮০৭ শিখ, ৫৫ খ্রিস্টান, ২ বৌদ্ধ, ২ পার্সি) যারা এ দেশে ঢোকার আগে থেকেই লং-টার্ম ভিসা পাওয়ার আওতায় ছিলেন, তারা বাদ দিয়ে একটি মানুষও এই  CAA 2019 মোতাবেক নাগরিকত্ব পাবেন না। অর্থাৎ, উদ্বাস্তুদের সর্বহারা করার ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত।

পরিশেষে বলি, বাঙালি উদ্বাস্তুর একটাই দাবি—CAA 1986, CAA 2003, CAA 2019 বাতিল কর, বাতিল কর। দেরিতে আসা উদ্বাস্তুদের জমির পাট্টা না-থাকলে পাট্টা দাও। উদ্বাস্তুদের সামাজিক ও প্রশাসনিক হয়রানি করা যাবে না।

কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে সন্দেহের নিরসনার্থে যদি সরকারকে আলাদা পরিচয়পত্র বানিয়ে দিতে হয় কারোর জন্য, তা করার প্রভিশন CA 1955-তেই রয়েছে। উদ্বাস্তু দরদ দেখাতে হলে সেই শর্তহীন সাহায্য করো। জন্মসূত্রে শর্তহীন নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দাও।

…………………

পড়ুন

কবিতা

সুনীল শর্মাচার্যের একগুচ্ছ কবিতা

সুনীল শর্মাচার্যের ক্ষুধাগুচ্ছ

লকডাউনগুচ্ছ : সুনীল শর্মাচার্য

সুনীল শর্মাচার্যের গ্রাম্য স্মৃতি

গল্প

উকিল ডাকাত : সুনীল শর্মাচার্য

এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প: সুনীল শর্মাচার্য

আঁধার বদলায় : সুনীল শর্মাচার্য

প্রবন্ধ

কবির ভাষা, কবিতার ভাষা : সুনীল শর্মাচার্য

ধর্ম নিয়ে : সুনীল শর্মাচার্য

মুক্তগদ্য

খুচরো কথা চারপাশে : সুনীল শর্মাচার্য

কত রকম সমস্যার মধ্যে থাকি

শক্তি পূজোর চিরাচরিত

ভূতের গল্প

বেগুনে আগুন

পরকীয়া প্রেমের রোমান্স

মুসলমান বাঙালির নামকরণ নিয়ে

এখন লিটল ম্যাগাজিন

যদিও সংকট এখন

খাবারে রঙ

সংস্কার নিয়ে

খেজুর রসের রকমারি

‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ পাঠ্যান্তে

মোবাইল সমাচার

ভালো কবিতা, মন্দ কবিতা

ভারতের কৃষিবিল যেন আলাদিনের চেরাগ-এ-জিন

বাঙালিদের বাংলা চর্চা : খণ্ড ভারতে

দাড়ি-গোঁফ নামচা

নস্যি নিয়ে দু-চার কথা

শীত ভাবনা

উশ্চারণ বিভ্রাট

কাঠঠোকরার খোঁজে নাসা

ভারতীয় ঘুষের কেত্তন

পায়রার সংসার

রবীন্দ্রনাথ এখন

কামতাপুরি ভাষা নিয়ে

আত্মসংকট থেকে

মিসেস আইয়ার

ফিরবে না, সে ফিরবে না

২০২১-শের কাছে প্রার্থনা

ভারতে চীনা দ্রব্য বয়কট : বিষয়টা হাল্কা ভাবলেও, সমস্যাটা কঠিন এবং আমরা

রাজনীতি বোঝো, অর্থনীতি বোঝো! বনাম ভারতের যুবসমাজ

কবিতায় ‘আমি’

ভারতে শুধু অমর্ত্য সেন নয়, বাঙালি সংস্কৃতি আক্রান্ত

ধুতি হারালো তার কৌলীন্য

ভারতের CAA NRC নিয়ে দু’চার কথা

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...