shubhobangladesh

সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়…

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৮তম পর্ব

Little Magazine
Little Magazine

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৮তম পর্ব

জ্যোতি পোদ্দার

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা – ১৮তম পর্ব

ষোল

ইংরেজি ১৯৮০ সালের শেষের দিকে, মানে বাংলা ১৩৮৭ সনের আশ্বিন-অগ্রহায়ণ প্রান্তিকে প্রকাশিত হয় ‘মানুষ থেকে মানুষে’। টাউন শেরপুরে প্রকাশিত সকল কাগজের মাঝে এই কাগজের নামাঙ্কন আলাদা বৈশিষ্ঠ্যের আলাদা রঙের আলাদা চৈতন্যের দিশা নিয়ে হাজির—মানুষ থেকে মানুষে। মানুষের ভেতর থেকে মানুষের দিকে যাত্রা। অনাবাদী জমিন থেকে আবাদী জমিনের দিকে যাত্রা। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা।

রক্ত মাংসের যে মানুষ প্রকৃতিলগ্না; যে মানুষ খেটে খাওয়া মানুষ; যে মানুষের শিরদাঁড়া দৃঢ় ও স্থানিক যে মানুষ সমাজ রূপান্তরের যাত্রিক। সেই মানুষের অন্বেষণে বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর যাত্রা। ‘মানুষ থেকে মানুষে’ ত্রৈমাসিক সাহিত্য সংকলন।

সকল প্রান্তিকে ধারাবাহিকতা না-থাকলেও, এটিই টাউন শেরপুরে গোষ্ঠীবদ্ধ কাজের দীর্ঘমোয়াদী পত্রিকা। বিশটি সংখ্যা প্রকাশ পাবার পর আর দলবদ্ধতা থাকেনি; যত না আদর্শের তার চেয়ে বেশি রুটি-রুজির প্রশ্নে সংগঠকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েন। হয়ে ওঠা একটি ছোটকাগজের মৃত্যু হলো অকালে।

.

‘যখন মানুষ পাবে মানুষের সন্মান

তখন মানুষ যাবে জীবনে,

সৃষ্টির তীর্থ ভূমিতে, মানুষ হবে মহীয়ান।’

.

এই ছিল বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর প্রত্যয়। তাদের দিশা। ছিল আহ্বান… ‘আসুন জীবনের খোঁজে বেরোই।’ ‘মানুষ থেকে মানুষে’র হাল ধরেছিরেন মূলত দুজন। প্রিন্টার্স লাইনে থাকত, ‘রবিন পারভেজ ও ক্যামেলিয়া সান্ন্যাল কতৃর্ক সম্পাদিত এবং বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্টি কর্তৃক প্রকাশিত।’ ইউনুস প্রেসে মুদ্রণ। প্রচ্ছদ ও ব্লক কখনো সংগৃহীত কখনো কমল চক্রবর্তী কিংবা বিজন কর্মকার করেছেন।

কমল চক্রবর্তী ‘মানুষ থেকে মানুষে’র জন্যে কেবল প্রচ্ছদ বা প্রচ্ছদ চিত্রের ব্লকের কাজটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, উনি ছিলেন নেপথ্যের একজন সক্রিয় কর্মী। পৌর টাউন হলে ‘বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠী’র সাহিত্য অনুষ্ঠানগুলিতে, কাগজের সার্কুলেশন, লেখা সংগ্রহে বা বিভিন্ন পরিকল্পনায় উনার ছিল সক্রিয় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।’ বললেন সম্পাদক রবিন পারভেজ।

টাউন শেরপুরে টাউন হলে বিভিন্ন সময়ে বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর ব্যানারে আয়োজিত হতো তরুণ কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। মফস্বলে কবিতাকে ভালোবেসে কবিতা পাঠ নিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করা সহজ কাজ ছিল না। হল ভর্তি দর্শকের উপস্থিতি সেই সময়ের কবিদের সাহিত্য সাধনার পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। এমন কাজগুলোর কারিগর ছিলেন কমল চক্রবর্তী।

শিল্পের জন্য শিল্প নয়—জীবনের জন্য শিল্পের দিকে দিশা ছিল ‘মানুষ থেকে মানুষে’র। কাজে কাজে যতটুকু সম্ভব কবিতাকে মানুষের কাছে নিয়ে যাবার তাগিদ ছিল বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কখনো গঙ্গেশ চন্দ্র দে, কখনো সরকারি কলেজের অধ্যাপক বা পৌরসভার চেয়ারম্যান।

পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন দেবাশীষ চক্রবর্তী, বৃতেন্দ্র মালাকার ও উদয় শংকর রতন। সম্পাদক রবিন পারভেজ ও ক্যামেলিয়া সান্ন্যাল—দু’জনেই পৈতৃক নাম ছেড়ে এই নামেই থিতু হন। পরিচিত হয়ে ওঠেন কবিতা লিখিয়েদের মাঝে। টাউন শেরপুরে ছোটকাগজ আন্দোলনে গতিশীলতা সৃষ্টি করেন ‘মানুষ থেকে মানুষে’র এই দুই সম্পাদক।

রবিন পারভেজ জন্ম ১৯৬২। তাঁর বেড়ে ওঠা গত শতকের আটের দশকে। বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠী গঠন করার আগে তিনি প্রকাশ করেন ‘মন্বন্তর’। প্রকাশকাল ১৯৮০। গোটা চারেক সংখ্যা প্রকাশের পর বন্ধ হয়ে যায় এই দ্বিমাসিক কাগজ। মন্বন্তরেরর উপদেষ্টা ছিলেন অগ্রজ কবি গঙ্গেশ চন্দ্র দে ও আবদুর রেজ্জাক। ‘মন্বন্তর’ কল্লোল সাহিত্য গোষ্ঠীর কাগজ।

কাগজটি সস্পর্কে রবিন বললেন, ‘নামটির (মন্বন্তর) জন্য খুব একটা অপেক্ষা করতে হয়নি। সাহিত্যের এমন দুর্ভিক্ষ কবলিত জনপদের কাগজের নাম তো মন্বন্তর-ই হওয়া চাই।’ কাগজ বন্ধ হওয়া স্থানিক ছোটকাগজ চর্চার নিয়তি। বিকাশের আগেই দাফন কাফন।

এখানে সম্পাদক জানাচ্ছে কেন মন্বন্তরকে থেমে যেতে হলো। অপ্রাতিষ্ঠানিকতা, চলমানকে চ্যালেঞ্জ চিন্তার ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা, দৈনিক সাহিত্যের সাময়িকী প্রত্যাখ্যানের ধারায় মন্বন্তরকে নিয়ে এগুতে চেয়েছিলাম। স্থানিক বাস্তবতায় যা সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।… মন্বন্তরকে বন্ধ রেখে আমি অনুসন্ধান করছিলাম কি করে কাদের নিয়ে একটি সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।২৭

রবিন পারভেজের কাগজ সম্পাদনা-জীবন দীর্ঘদিনের। গত চল্লিশ বছর ধরে তিনি কোনো-না-কোনো কাগজ সম্পাদনার কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সক্রিয়ভাবে; কখনো এককভাবে কখনো যৌথতায়।

কনকাঞ্জলি (১৯৭৯), মন্বন্তর (১৯৮০), দৃষ্টি কথা বলবে (?), মানুষ থেকে মানুষে (১৯৮০), ছাপ (১৯৯২), রা (১৯৯৮), বিহান (২০১৮) ইত্যাদি তাঁর নিজের বা যৌথতায় সম্পাদিত ছোটকাগজে পরিচ্ছন্নতা বা রুচিশীলতার পরিচয় মেলে।

কলেজে পড়ার সময়েই দ্বান্দ্বিক বাস্তুবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন রবিন। চিন্তা ও যাপনে তিনি মার্ক্সবাদী। মার্ক্সেই খুঁজে পেয়েছেন বর্ণহীন বর্গহীন মানবসমাজ বির্নিমানের চিন্তাসূত্র।

.

‘একটি মানুষ কী অতৃপ্ত হৃদয়ে একা। চলে যায় চলে যায় পৃথিবীর

আড়ালে অস্থির।

দুইটি মানুষ শুধু মুখোমুখি দাঁড়ায় এসে। চাঁদ আর সূর্যকে রাখে

ঝুলিয়ে সামনে।

তিনটি মানুষ আঁকে নিজস্ব বৃত্ত পৃথক। বিন্দুকে ভেঙে চায়

আপন সত্তার মাঝে।

(মানুষের কবিতা : রবিন পারভেজ)

.

গত শতকের তরুণদের বেড়ে ওঠার ক্যানভাস ছিল ভিন্ন। সেই সময়ে বেড়ে ওঠা সম্পাদক ও কবি রবিন পারভেজ লিখেছেন, ‘…আশেক মাহমুদে পড়ি। সারা বিকাল শহরময় রেলওয়ে স্টেসনে একা একা ঘুরে বেড়াই। এভাবেই একদিন এই রেলওয়ে স্টেশনের বুক স্টলটির সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এখানেই রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন, দেবী প্রসাদ, তলস্তয়, গোর্কি, দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, নিকোলাই তিখনভ, নাদেজদা ক্রুপস্কায়া, আন্তন মাকারেঙ্কো, জন রীড লেনিন, কার্ল মার্ক্সদের সাথে পরিচয় ঘটে। পরিচয় ঘটে দ্বান্দিক বস্তবাদের সাথে।’২৭

রবিনের এই পরিমণ্ডলে ঘটে যায় তাঁর পুনর্জন্ম। ‘নিজের ভেতর এক আলোকিত পরিবর্তন উপলব্ধি করি।… বেশ বুঝতে পারি আমার ভেতর শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়াচ্ছে—নাস্তিকতা।’২৭

রবিনের প্রকাশিত বই ‘দৃশ্যের ওপাশে চিহ্নের আড়ালে’ (১৯৯৯)। নিজের প্রকাশনি ‘রা’ থেকে বের করেন। যদিও তিনি প্রকাশনি কার্যক্রমে সক্রিয় নন, তবু তাঁরটি ছাড়াও তরুণ কবি কোহিনুর রুমার কবিতার বই ‘নীল উপাখ্যান’ প্রকাশ করেন রবিন পারভেজের কেয়ার অফে। তবে এখানে তথ্য হিসেবে বলে রাখি, ‘দৃশ্যের ওপাশে চিহ্নের আড়ালে’ প্রকাশের আগে রবিন পারভেজ ‘বন্ধন’ (১৯৭৯) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ করেন।

স্থানিকে আরেকটি বড় গুণ হচ্ছে, কেউ কারো কবিতা নিয়ে কথা বলেন না। চলছে ফিরছে আড্ডা দিচ্ছে চা বিড়ি টানছে। অপরের কবিতা বা পত্রিকা নিয়ে রা নাই। রাজা উজির মারছে, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান করছে বা তত্ত্বের গোষ্ঠী উদ্ধার করছে, কিন্তু স্থানিক কবির কোনো গ্রন্থের বেলায় ‘এখনো পড়িনি’, ‘দাঁত ব্যথা’, ‘দারুণ ব্যস্ত, ঝামেলায় আছি’—ইত্যাদি বাক্যই শুনলাম শুধু।

কেউ লিখেছেন বলে মনে পড়ে না। অথচ পত্রিকা করছেন ফি বছর। নিজের কাগজকে আলাদা করে ভাবছেন বটে, তবু অন্য কবির কবিতা নিয়ে আলোচনা নয়। গদ্যচর্চার জায়গাটি স্থানিকে নেই। কাজে কাজে চিন্তার জড়তাও কাটে না।

অগ্রজ কবি রবিন পারভেজ কিংবা সুহৃদ জাহাঙ্গীর প্রকাশিত বই নিয়ে কাউকে লিখিত আলোচনা করতে দেখিনি। তেমনি অগ্রজেরা কলমটি পকেটে ঠিক ঠিক গুজে রেখেছেন। বের করে দেখাননি। পাছে সংঘ ভেঙে যায়। অথবা এই বুঝি অপরে প্রশংসিত হয়ে গেলর ভয়ে। অথবা তরুণের ‘কবিতা ছবিতা’ কিছুই হয়নি গোছের ভাবনা নিয়ে বাস করেন গিরিশৃঙ্গে।

যাক সে কথা। বলছিলাম ‘মানুষ থেকে মানুষে’র কথা। বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত যেসব কবিতা আমার ভালো লেগেছে, সেগুলো টুকে দিচ্ছি।

.

১.

মানুষ বোঝে না মানুষের দুঃখ-শোক

বুঝতে চায় না তার বেদনা অশ্রুআর্তি।

প্রচণ্ড রোদে শুকায় মানুষের লোনাঘাম।

(মানুষ : সফিকুর রাহমান)

২.

প্রেম দিয়ে প্রেম

ভাষা দিয়ে ভাষা

আশা দিয়ে আশার মুকুট

জীবনের বিনিময়ে কোথায় জীবন?

(মানুষ কোথায় : এম এ সাত্তার)

৩.

আমরা পরস্পর ক্রমাগত

একে অপরের বিরুদ্ধে

দেয়াল তুলছি।

…   …   …

মানুষের অজান্তে মানুষ

মানুষের মধ্যে ক্রমাগত

দেয়াল তুলছে,

আর কত দ্রুত সরে যাচ্ছে

আগামীকাল ও ঈশ্বর

(দেয়াল : উদয় শংকর রতন)

৪.

একটু মাটি একটু মাটি

আরেকটু মাটি।

একটি হাত একটি হাত

আরেকটি হাত।

এমনি এমনি এমনি করে

পাহাড় ভাঙে ছাউনি ওঠে

এমনি এমনি এমনি করে

ছাউনি ওঠে

ওঠে ছাদ।

(সমবায় : সোফিওর রহমান)

৫.

মিতুল তোমায় ডাকছে শোন

মায়ের আঁচল কৃষ্ণচুড়া

চাঁদ কপালী বকনা বাছুর

ঝিনুক পালক খেলার নুড়ি।

(মিতুলের জন্য কবিতা : শুভ্র সোম)

৬.

ইতস্তত পড়ে আছে কয়েকটি করোটি

কিছু হাড়গোড়।

চারপাশে ছড়িয়ে আছে উৎকট বিশ্রী গন্ধ

মাঝখানে তুমি দাঁড়িয়ে নির্বিকার।

(তুমি এবং কতিপয় লাশ : মেহেদী ইকবাল)

৭.

ব্যাস। সব শেষ।

আর নয়—এবার ফিরবো।

শান্ত ছায়ায়;

শুকনো পাতার মর্মর সুরের কাছে।

সারিবদ্ধ পিঁপড়ের মতো

মাটির দিকে—

(অস্পষ্ট : দেবাশীষ চক্রবর্তী)

৮.

টুসি—আজো তুমি এক বাচাল কুমারীর মতো

ঠোঁটে তুল শব্দের খোয়া ছুঁড়ে মারো বয়সিনী

সংসারের দিকে।

(টুসি : বৃতেন্দ্র মালাকার)

.

বিভিন্ন সংখ্যায় গল্প লিখেছেন—গঙ্গেশ চন্দ্র দে, দেবাশীষ চক্রবর্তী, বৃতেন্দ্র মালাকার, মনিকা চক্রবর্তী, ক্যামেলিয়া সান্ন্যাল, উদয় শংকর রতন প্রমুখ। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, মানুষ থেকে মানুষে কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পরই নিয়মিত বিভাগে যুক্ত হয় ‘বিশ্ব সাহিত্য থেকে’।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বই থেকে সংগৃহীত লেখা ও লেখক পরিচিত যুক্ত করে কাগজটি আলাদা মাত্রা পায়। ক্রমে যুক্ততা বাড়ে বিশ্ব সাহিত্যের দিকপালদের লেখা স্থানিক পাঠকদের পরিচয় ঘটিয়ে দেয় এই পুনর্মুদ্রণ।

জার্মান লেখক গটথোল্ড ইফ্রাইম লেসিং, কার্ল মার্ক্স-সহ প্রমুখ লেখকের নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করে। উনবিংশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় কার্ল মার্ক্সের কবিতাসহ একটি ছোট্ট ভূমিকা।

বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর যে চার-পাঁচজন সংগঠক ছিলেন তার মধ্যে রবিন পারভেজই এখনো সক্রিয়। কবি উদয় শংকর রতন ও ক্যামেলিয়া সান্ন্যাল পরপারে, দেবাশীষ চক্রবর্তী দেশান্তরী, আর বৃতেন্দ্র মালাকার—ঠাকুর অনুকুলের শরণ নিয়ে ধর্মপ্রচারক; সাদা মার্কিন কাপড় শরীরে জড়িয়ে ঘুরছেন সারাদেশ টাউন শেরপুরের এক সময়ের এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

একবার রবিন পারভেজ তাঁর সময়ের কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘কবিতা কথা সংসদ’-এর ব্যানারে ‘দৃষ্টি কথা বলবে’ কাগজটির কাজ সজবরখিলায় ইউনুছ প্রেসে এগিয়ে চলতে থাকে আর নিউ মার্কেটের সবুজ চত্বরে সাহিত্য আড্ডা নিয়ে, কাগজ নিয়ে আমাদের নানা পরিকল্পনাও গুছিয়ে উঠতে থাকে। দিবসকেন্দ্রিক নয়, ধারাবাহিক সাহিত্য প্রচেষ্টার কাগজের প্রকাশনায় বেগবান করতে হবে। পরিচ্ছন্ন, সুসম্পাদনায় মনোযোগী হতে হবে।… সাহিত্য শুধুমাত্র ভাব-বিহ্বলতা প্রকাশের নয়; সুচিন্তিত দৃষ্টিপাত বোধ-বুদ্ধি দর্শনও। এমন অবস্থানগত মতাদর্শিক স্ট্যান্ড শেরপুরের সেই সময়ের অন্যান্য প্রকাশনা থেকে আমাদের আলাদা করতে থাকে।’২৭

রবিন পারভেজরা আরেকজন সহযোদ্ধা পেয়েছিলেন যার নাম মনিকা দেবী চক্রবর্তী। আটের দশকে একজন নারী সহযোদ্ধা পাওয়া সত্যি কঠিন ছিল। মনিকা দেবী গল্প লিখতেন, দেবাশীষ চক্রবর্তীর সহধর্মিনী। তিনিও প্রয়াত। তিনি জানালেন সেই সময়ের আড্ডায় দেবী ছিলেন আমাদের সহকর্মী ও সহমর্মী।

মানুষ থেকে মানুষে—একটি সাহিত্য সংকলন। রবিন পারভেজ লিখেছেন, ‘এটিকে আমি ছোটকাগজ বা লিটলম্যাগ বলব না। প্রচলিত সাহিত্য ধারণার মধ্যে থেকেই সৃজনপ্রয়াসী প্রচেষ্টা। সাহিত্যকে সার্বক্ষণিক ধ্যান-জ্ঞান করে চর্চার নিরবিচ্ছন্ন একটি প্রতিষ্ঠাই বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর ঐকান্তিক লক্ষ ছিল। সম্পাদনা পরিষদের একাগ্রতা আর নিরলস শ্রমের দিশায় ত্রৈমাসিক হিসেবে মানুষ থেকে মানুষে তার বিশতম সংখ্যা অব্দি পৌঁছে গিয়েও শেষমেশ নোঙর ফেলতে হলো। জীবন সংগ্রামে বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর চার বিহঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রকাশনা মুখ থুবরে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ‘মানুষ থেকে মানুষে।’২৭

বিহঙ্গ সাহিত্য গোষ্ঠীর অন্য পারিষদ ছিলেন—দেবাশীষ চক্রবর্তী, বৃতেন্দ্র মালাকার ও উদয় শংকর রতন। এই তিন তরুণও সত্তর দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত মাতিয়ে রেখেছেন শেরপুরের সাহিত্যচর্চার চাতাল।

বৃতেন্দ্র মালাকার (১৯৫৪) কৈশোর বয়স থেকেই কবিতা লেখার হাতে খড়ি। ‘ষাটের দশকের শেষের দিকে যখন দেশভাগজনিত রোগে আক্রান্ত দেশ মাটি মানুষ ‘সেই সময় কবিতা এলো আমার জীবনে। আছে থৈ থৈ জলাধার। অনন্ত পিপাসা তবু, বুকে হাহাকার।’২৪

এই হাহাকার বৃতেন্দ্রকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে সারাজীবন। ‘মানুষ থেকে মানুষে’ যুক্ত হবার আগে বের করলেন ‘চতুরঙ্গ’, ১৯৭৬ সালে। দুটি সংখ্যা বের করতে পেরেছেন। আশির দশকের শেষের দিকে ‘ক’, ‘রক্ত মাংসের স্বাদ’, ‘সূর্যকরোজ্জ্বল নিজ দেশ’ ছোটকাগজ প্রকাশ করলেও, কোনোটিই একাধিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। এই কাগজগুলো ‘বিরাশি থেকে নব্বইয়ের মধ্যে বেরিয়ে এলো।২৪

আশির দশকেই তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে কবিতা নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মিছিলে, মিটিং, আড্ডায়। ‘যে কোনো সভা সমিতিতে তখন আমার কবিতা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রথম উচ্চারিত হতো।’২৪

যার ফলশ্রুতিতে কয়েকটি মামলা, পুলিশি হামলার কারণে বেছে নিলেন ফেরারী জীবন। সেই সময়ে বৃতেন্দ্র মালাকারের কবিতা ‘গণতন্ত্র যখন ফার্স্টলেডির হেরেমে’ খুবই উচ্চকিত লোকপ্রিয় কবিতা হয়ে ওঠল, জানালেন তিনি।

বৃতেন্দ্রের কবিতার মূল স্বর মানুষ। তাঁর কবিতায় ‘মানুষ’ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। ‘মানুষ থেকে মানুষে’ পর্যায় যে সকল কবিতা প্রকাশিত হয়েছে—প্রায় সবগুলো কবিতায় ঘুরে ফিরে ওঠে এসেছে মানুষ। তিনি আমাকে ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছেন, ‘মাঠ নদী বনজঙ্গল গ্রাম শহর দালান নিয়ে দেশ নয়—দেশের পরিচয় মানুষ; সত্যিকারের মানুষ নিয়ে দেশ।’২৪

.

ক.

এমন অনেক মানুষ আছে, মানুষ!

দু’আঙুলে তার করবী বিষ,

মুখে কথার ফানুস

আকাশে ওড়ায়

বাতাসে ছড়ায়।

(মানুষ থেকে ফানুস : বৃতেন্দ্র মালাকারের)

খ.

মানুষ তবু মরেনি

মানুষ এখনো মরেনি বলেই

মানুষ প্রতিবাদ মুখর

জীবন প্রয়াসী।

(যে মানুষ রক্তের কথা কয় : বৃতেন্দ্র মালাকারের)

গ.

তোমাদের শব্দের শায়ক বিদ্ধ করো বিদ্ধ করো বিদ্ধ করো

এ সকল পাতকী সমাজে

ঝলসে ওঠো

তপ্ত রোদে

মধ্যাহ্নের ব্যাধ।

(চরম পত্র : বৃতেন্দ্র মালাকারের)

ঘ.

এই আমি আলোক বিহারী

মানুষ, এক মানুষের বিভা

সতত জাগে দিবস শর্বরী

ঝলকে ওঠে মনন বোধে গ্রীবা।

(মানুষ : বৃতেন্দ্র মালাকারের)

আমি আর পারি না,

সামনে স্টেশন

আমার বন্ধু অপেক্ষা করছে

আমি রওনা হয়েছি

আমি যাবই

… … …

উচ্চকণ্ঠে আমি বলে রাখি

তোমরা আমার বন্ধুকে কেউ কি চিনেছে?

নাম তাঁর সমাজতন্ত্র;

সামনের স্টেশানেই সে অপেক্ষারত।

(আমার বন্ধুর নাম : বৃতেন্দ্র মালাকারের)

.

বৃতেন্দ্র মালাকারের সামনের স্টেশনে বন্ধু সমাজতন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করলেন না। তিনি রাজশাহী থেকে শেরপুরে ফেরার পথে নেমে পড়লেন পাবনার হেমায়েতপুরে। হ্যাঁ, তিনি শরণ নিলেন ঠাকুর অনুকুলের আশ্রয়ে তাঁর আশ্রমে। পাল্টে দিলেন যাপনের রসায়ন। ডুব দিলেন গভীরে। জীবনের উৎসমূলে।

তিনি লিখেছেন, ‘উৎসমুখী জীবন বাসনা ধরতে পাররেই বাচন।’২৪ তাই সেই বাচনের বাচক হবার জন্য তার কবিতার মূল সুরের সাথে মিলিয়ে নিলেন ঠাকুর অনুকুলের সারাৎসার। ‘মানুষ আপন টাকা পর, যত পারিস মানুষ ধর।’

ক্যামেলিয়া সান্যাল—এ নামেই তিনি স্থানিক সাহিত্যকর্মীদের মাঝে পরিচিত। পৈতৃক নাম তপন চক্রবর্তী (১৯৫৭)। ডাকনাম মিন্টু চক্রবর্তী। ক্যামেলিয়া ছদ্মনাম নেবার পূর্বে তিনি তপন লোকান্তর নাম নিয়ে রবিন পারভেজের সাথে যৌথ সম্পাদনা করেছেন দ্বি-মাসিক সাহিত্যপত্র ‘মন্বন্তর’ (১৯৮০)। অবশ্য এই কাগজটি স্থায়ীত্ব পায়নি। চারটি প্রান্তিকের পর বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটির উপদেষ্টা ছিলেন গঙ্গেশ চন্দ্র দে ও আবদুর রেজ্জাক।

.

ক.

প্রতিদিন প্রতারক পিতার ছায়া ভেসে উঠে

স্বাধীন আকাশে। কাঁচের ভেতর থেকে

শকুন সাদৃশ্যচোখ মাংস ছিঁড়ে খায়

প্রিয় হৃদয়। ডেকে আনে নীলাদ্র রাত।

(তৃতীয় আকাশ : ক্যামেলিয়া সান্যাল)

খ.

সন্দীপ জানালাটা বন্ধ করে দে, নয়তো

খুলে দে ঝটপট।

একটা কিছু কর।

একটা কিছু হোক।

হয় আলোতে জীবন দেখি

অন্ধকারে মৃত্যু দেখি নয়তো।

(সন্দীপ তোর প্রতি : ক্যামেলিয়া সান্যাল)

.

ক্যামেলিয়ার কবিতা নিজস্ব স্বর নির্মাণের ভিত্তি রচিত হলেও, ‘মানুষ থেকে মানুষে’ পত্রিকার পর আর বিকশিত হয়নি। ক্যামেলিয়া সান্যালকে আমি দেখিনি। শুনেছি ঢের। সত্তর আশির দশকে এই তরুণেরা স্থানিক শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনকে উজ্জ্বল করে রেখেছিলেন।

রোজিনা তাসমীন সেই সময়ে ‘মানুষ থেকে মানুষে’ লিখতেন। এখনো তিনি লিখছেন; ব্যক্তিজীবনে ব্যাংকার। তিনি ক্যামেলিয়া নিয়ে যে স্মৃতি কথকতাটি লিখেছেন আমার অনুরোধে সেটিই তুলে দিচ্ছি। স্থানিক সাহিত্যের চাতাল নির্মাণে কেমন জীবনযাপন ছিল সত্তর আশির কবিদের এমন ভাবনা থেকেই মূলত এই স্মৃতি কথকতাটির অবতারণা।

রোজিনা তাসমীন লিখেছেন, ‘ছিপছিপে লম্বা, গায়ের রং ফর্সা ছিল। লম্বা চুল বেশ টিপটপ ছিলেন। রাস্তা দিয়ে আপন মনে হেঁটে যেতেন। জিকে স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে প্যারামেডিক্যাল কোর্স করেছেন। ঔষধ বিক্রেতা হিসাবে শহরের বটতলায় আনসার মোল্লার ঔষধের দোকানে চাকরি করতেন।

সেখানেই ইলা চক্রবর্তী নামে এক তরুণীর সাথে তার পরিচয় এবং একসময় তাকে বিয়েও করেন। পরবর্তী সময়ে নয়আনী বাজার কলা হাটিতে নিজস্ব দোকান দেন। তিনি গরীব রোগীদের বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্রও লিখে দিতেন। গরীব মহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর অনেকেই তার জন্য আকুল হয়ে কেঁদেছে, আফসোস করেছে।

তরুণ বয়সে লম্বা চুলের ক্যামেলিয়া সান্যাল মুগ্ধ হওয়ার মতো কবিতা লিখতেন। বেশ ভালো লিখতেন। সম্ববত ‘মানুষ থেকে মানুষে’ নামে একটা ম্যাগাজিন রবীন পাভেজের সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করতেন। বিভিন্ন স্থনীয় পত্রিকা/ম্যাগাজিনে লিখতেন। গানে নয়, তবলায় তার আগ্রহ ছিল। বাসায় ছোট বোন ক্ষমা চক্রবর্তী গান গাইতেন আর ওনি তবলা বাজাতেন।

তার দুটো ছেলে-মেয়ে ছিল—‘দোলা’ আর ‘উচ্ছ্বাস’। রাতে বাসায় ফিরেই আগে ছেলেকে কোলে বসিয়ে তবলা নিয়ে বসতেন। নিজে বাজাতেন ছেলেকেও শিখাতেন। ছেলের তখন ৩ বছর বয়স। বাসায় মেয়ের গানের সাথেও তিনি তবলা বাজাতেন। তিনি অভিনয় শিল্পী ছিলেন। মাঝে মাঝে টাউন হলে মঞ্চায়িত নাটকেও তিনি অভিনয় করেন।

দেশ স্বাধীন হলে তপন চক্রবর্তীরা চলে আসেন পূর্বের বাসায়। ১৯৭৬ সালে হঠাৎ বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়ে বিধায় বাসাটি ছেড়ে দিয়ে বিনা ভাড়ায় বাগবাড়ীতে এক শুভকাঙ্ক্ষির বাসায় গিয়ে উঠে। পরবর্তী সময়ে ৬ ভাইবোনের সংসারে আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছ্ল হলে পুরাতন গরুহাটীতে নিজস্ব জায়গা কিনে বসবাস শুরু করে। এই বাড়াতেই তপন চক্রবর্তী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেদিন ছিল ১৮ই আগস্ট/২০০১ তপন চক্রবর্তী সন্ধায় বাড়ি ফেরার পথে গলির মুখে রিকশা থেকে নামতেই জ্ঞান হারান।

গলির মুখে এক বাসায় নিয়ে তার মাথায় পানি ঢাললে হুস ফিরে আসে। অন্যের সহযোগিতায় বাসায় আসেন। হেঁটে পাশের বাসায় বোনের কাছে যান। পরে বোনসহ আবার নিজের ঘরে ফিরে আসেন এবং শরীর খারাপ লাগছে বলে শুয়ে পড়েন। ওনাকে শুইয়ে দিয়ে দিদি চলে যান।

আধা ঘণ্টা পরে এসে মাথার কাছে বসে ডাক দিতেই তপন চক্রবর্তী চোখ তুলে তাকান। তার পর একটা হেঁচকি দেন এবং দিদির কোলে ঢলে পড়েন। এভাবেই হঠাৎ করে তপন চক্রবর্তী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সম্ভাবনাময় কবি ক্যামেলিয়া সান্যাল চিরতরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যান।’

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

রাংটিয়া সিরিজ : জ্যোতি পোদ্দার

তিলফুল : জ্যোতি পোদ্দার

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা

প্রবন্ধ-গবেষণা

টাউন শেরপুরে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী

শেরপুরে ছোটকাগজ চর্চা

১ম পর্ব । ২য় পর্ব । ৩য় পর্ব । ৪র্থ পর্ব । ৫ম পর্ব । ৬ষ্ঠ পর্ব । ৭ম পর্ব । ৮ম পর্ব । ৯ম পর্ব । ১০ পর্ব । ১১তম পর্ব । ১২তম পর্ব । ১৩তম পর্ব । ১৪তম পর্ব । ১৫তম পর্ব । ১৬তম পর্ব । ১৭তম পর্ব । ১৮তম পর্ব

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন...