বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

1 0
Read Time:21 Minute, 7 Second
Bangabandhu

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

প্রদীপ মিত্র

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

নমি আমি, কবি-গুরু তব পদাম্বুজে,

বাল্মীকি। হে ভারতের শিরশ্চূড়ামণি

তব অনুগামী দাস, রাজেন্দ্র-সঙ্গমে

দীন যথা যায় দূর তীর্থ-দরশনে!

তব পদ চিহ্ন ধ্যান করি দিবানিশি,

পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে,

দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে—

অমর! শ্রী ভর্তৃহরি; সূরী ভবভূতি

শ্রীকণ্ঠ, ভারতে খ্যাত বরপুত্র যিনি

ভারতীর কালিদাস, সুমধুর ভাষী;

মুরারিমুরলী-ধ্বনি-সদৃশ মুরারি

মনোহর; কীর্ত্তিবাস, কৃত্তিবাস কবি

এ বঙ্গের অলঙ্কার! হে পিতঃ কেমনে

কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কূলে

মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি!

গাঁথিব নতুন মালা, তুলি সযতনে

তব কাব্যোদানে ফুল; ইচ্ছা সাজাইতে

বিবিধ ভূষণে ভাষা; কিন্তু কোথা পাব

(দীন আমি!) রত্নরাজি তুমি নাহি দিলে,

রত্নাকর? কৃপা, প্রভু, কর অকিঞ্চনে।

.

বাঙলা ভাষার স্থাপত্যসৌকর্যের পথপ্রদর্শক মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বাল্মীকি বন্দনা’ বিবৃত-কবিতাটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে কাব্য-রস-দর্শনের বাইরে নতুন প্রত্যয় উদ্ভাসিত হয়। তা হলো, ‘বাল্মীকি। হে ভারতের শিরশ্চূড়ামণি তব আনুগামী দাস’—বাক্যের ভেতর অখণ্ড ভারতের ভূরাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক অবস্থা তার নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সুস্পষ্ট এক ধারণা লাভ করা যায়।

ঠিক একইভাবে, ‘কীর্ত্তিবাস, কৃত্তিবাস কবি এ বঙ্গের অলঙ্কার’—এই বাক্যের ভেতরেও অর্জন করা যায়, অখণ্ড ভারতের ভেতর থাকা ‘এ বঙ্গের’ শব্দটিরও আলাদা শক্তির সুগম্ভীর দীপ্তিময় মাধুর্য। আর এখানেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিবৃত কবিতাটির অন্তর্গত ধ্বনির ভেতর গুঞ্জরিত হয় ‘এ বঙ্গের’ স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার দৃঢ়তা : ‘গাঁথিব নতুন মালা, তুলি সযতনে তব কাব্যোদ্যানে ফুল; ইচ্ছা সাজাইতে।’

এই বাক্যের প্রত্যেক শব্দে শব্দে অনুভূত হয় বঙ্গের তথা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের চিন্তাশক্তির বাঙ্ময়রূপ। এই পঙক্তির অন্তর্গত ধ্বনির মধ্যে আমরা অনুভব করতে পারি, জনক রাজসভায় দাঁড়িয়ে জনকদুহিতা সীতার জন্য সংকল্পিত রাম কর্তৃক হরধনু ভাঙ্গার সুস্পষ্ট দৃশ্য।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত রামের মতন নির্ভীক মননের উজ্জ্বলতায় ভারত থেকে বঙ্গের বিশিষ্ট স্বরূপ নির্ণীত হয় : ‘কৃত্তিবাস কবি এ বঙ্গের অলঙ্কার।’ এ পাঠের সঙ্গে সঙ্গে হরধনু ভাঙ্গার শব্দের বেগবান বীক্ষণ : ‘বাঙলা ভাষাচর্চার প্রগতিশীল এবং প্রতিবাদী ধারার ক্রমোন্নয়ন’, ‘বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’।

অতঃপর বিশ্বের বুকে সংযোজিত হয় দীপ্তিময় : ‘বাংলাদেশ’ নামের সার্বভৌমিক অভ্যুদয়। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে জীবন সংগ্রামের গভীর দীপ্তিও লাভ করা যায়। একই সঙ্গে কবিতাটির নান্দনিক সৌন্দর্যের গভীরতার ভেতর দপদপ করে ‘কর্মসৃজন, প্রকল্প প্রণয়ন ও উন্নয়ন তত্ত্ব’।

যে সময়ে পাঠ করি : ‘ইচ্ছা সাজাইতে বিবিধ ভূষণে ভাষা।’ এ বাক্যের গভীর জিজ্ঞাসায় আন্দোলিত হতে নেই তো বাধা। বাধা এই যে, চাইলেই তো সবকিছু পাওয়া যায় না। আর এ জন্য প্রকাশ পেয়েছে বিনম্র আত্মক দীনতা। এই দীনতা অবশ্যই অধীনতা নয়; স্বকীয় সত্তা উন্মোচনের প্রচেষ্টা।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের উত্তরবর্তী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ প্রচেষ্টার বাঙ্ময়শক্তি নির্মাণ করেছেন ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতায়। কবিতাটির পাঠ আমাদের জন্য জরুরি :

.

যে দিন হিমাদ্রিশৃঙ্গে নামি আসে আসন্ন আষাঢ়,

মহানন্দ ব্রহ্মপুত্র অকষ্মাৎ দুর্দাম দুর্বার

দুঃসহ অন্তরবেগে তীরতরু করিয়া উন্মূল

মাতিয়া খুঁজিয়া ফিরে আপনার কূল-উপকূল

তট-অরণ্যের তলে তরঙ্গের ডম্বরু বাজায়ে

ক্ষিপ্ত ধূর্জটির প্রায়; সেইমত বনানীর ছায়ে

স্বচ্ছ শীর্ণ ক্ষিপ্রগতি স্রোতস্বতী তমসার তীরে

অপূর্ব উদবেগভরে সঙ্গীহীন ভ্রমিছেন ফিরে

মহর্ষি বাল্মীকি কবি,

রক্তবেগ তরঙ্গিত বুকে

গম্ভীর জলদমন্ত্রে বারম্বার আবর্তিয়া মুখে

নব ছন্দ: বেদনার অন্তর করিয়া বিদারিত

মুহূর্তে নিল যে জন্ম পরিপূর্ণ বাণীর সংগীত,

তারে লয়ে কী করিবে, ভাবে মুনি কী তার উদ্দেশ—

তরুণগরুড়সম কী মহৎক্ষুধার আবেশ

পীড়ন করিছে তারে, কী তাহার দুরন্ত প্রার্থনা,

অমর বিহঙ্গ শিশু কোন বিশ্বে করিবে রচনা

আপন বিরাট নীড়।

…   …   …

ভাবের স্বাধীন লোকে, পক্ষবান অশ্বরাজ-সম

উদ্দাম সুন্দর গতি—সে আশ্বাসে ভাসে চিত্ত মম।

সূর্যেরে বহিয়া যথা ধায় বেগে দিব্য অগ্নিতরী

[ভাষা ও ছন্দ]

.

এ যেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দার্শনিক চিন্তন : ‘পরমাণু পরমাণুকে অবিরত ডাকিতেছে, এসো এসো বঁধু এসো।’ ‘জড়পিণ্ড সকল, গ্রহ উপগ্রহ ধূমকেতু—সকলেই এই মোহমন্ত্রে বাঁধা পড়িয়া ঘুরিতেছে। প্রকৃতি পুরুষকে ডাকিতেছে, এসো এসো বঁধূ এসো।’… ‘কমলাকান্তের বঁধূ কি আসিবে?’

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অনুভব করতে পারি, মাইকেল যেখানে সাতভাগির কাছ থেকে আপন বাস্তুভিটির খাত ও খতিয়ান নিঃসঙ্কোচে আলাদা করলেন, এ যেন তার উত্তরপ্রজন্মের জাতীয়তাবাদ আর সার্বভৌম চেতনার প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞানের উদ্বোধন।

এমন পর্যায়ে অনুভব করা যায়, পিতার অর্জিত ভূমার উপর সন্তানের দায় এবং দায়িত্বের দুর্বার স্পন্দন। ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতাটির ভেতর তেমন বিপ্লব, তেমন রাষ্ট্রগঠনের পীড়ন এবং তার দুরন্ত প্রার্থনা ব্রহ্মপুত্র নদের জলকে আলোড়িত বিলোড়িত করে ছুটে চলছে এক অমর শিশু : ‘কোন বিশ্বে করিবে রচনা আপন বিরাট নীড়।’

আমাদের অধীত আলোচনায়, মাইকেল মধুসুদন দত্ত হয়ে ওঠে ‘জড়পদার্থের ক্রিয়া’—যা রবীন্দ্রনাথে এসে হয়েছে : ‘ভাষা’। একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘ভাষা ও ছন্দ’ কবিতার ‘ছন্দ’ হয় ‘জড়পদার্থের গতি’।

বাল্মীকি তার প্রতিনিধি। যিনি স্রষ্টা, যিনি গৃহস্থ এবং যার আছে উদ্দাম সুন্দরগতি, যার ভেতর আছে দিব্য অগ্নিতরী আর সত্যের শিশিরসিক্ত সতেজ শির। আমার এ পাঠ-পর্যালোচনা দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী, অমর্ত্য সেন, লেভি ট্রাউস অনুসৃত।

আমার অনুসৃত পথে রবীন্দ্রনাথের অনিবার্য আলো : ‘বাঙালি বাংলাদেশে জন্মেছে বলেই যে বাঙালি তা নয়; বাংলা ভাষার ভিতর দিয়ে মানুষের চিত্তলোকে যাতায়াতের অধিকার পেয়েছে বলেই সে বাঙালি। ভাষা আত্মীয়তার আধার, তা মানুষের জৈব-প্রকৃতির চেয়ে অন্তরতর [সাহিত্যের পথে : সভাপতির ভাষণ]।’

ভাষার ভেতর দিয়ে এই যে মানুষের চিত্তলোকে যাবার আমার অধিকার, এই অধিকার আমরা আরো অনুভব করতে সক্ষম হবো প্রজন্ম পরম্পরা। আমি যদি কবি হতে চাই, তাহলে আমাকে পূর্বজনের কাছে যেতেই হয়, আবার যদি রাষ্ট্রবিপ্লবী বা সমাজসংস্কার কিংবা বিজ্ঞানী—যা কিছু হতে চাই; এ জন্যও পূর্বজনের কৃতি এবং কর্তৃত্বকে মান্যতায় আনতেই হয়; এটিই সংস্কার ও সংস্কৃতি; ঐতিহ্যরীতি। এর ভেতর নীতিশাস্ত্রের আলোও লাভ করা যায়।

এ পর্যায়ে বাল্মীকি, ভর্তৃহরি-ভবভূতি-শ্রীকণ্ঠ-কালিদাস আমাদের সর্বজনীন এবং সার্বভৌমিক চেতনার রত্নময় প্রাসাদ। এ নাম এক একটা সভ্যতার স্তরের জ্যোর্তিময় প্রতীক। ‘প্রতীক ব্যবহারের তাৎপর্য বহুমুখী’—এ-কথা দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বীর। অতঃপর এ পাঠের আলোকেও মাইকেল মধুসূদন দত্তের চিন্তাসৌন্দর্যের চিত্রময়তার পথ ধরে ‘এ বঙ্গের অলঙ্কার’ রূপ-ঐশ্বর্য অন্বেষণ করা যায়। বলি, ‘কোথা মনোহর কীর্ত্তিবাস, কৃত্তিবাস কবি!’ আমার অন্বেষণ…।

.

বঙ্গদেশে প্রভু করিলা প্রবেশ;

অদ্যাপিও সেই ভাগ্যে ধন্য বঙ্গদেশ।

পদ্মাবতী তীরে রহিলেন গৌরচন্দ্র;

শুনি সর্বলোক বড় হইল আনন্দ।

[চৈতন্যভাগবত]

.

বাঙলা ভাষার কবি বৃন্দাবন দাসের সময়ে গৌরচন্দ্র বঙ্গদেশে এসেছিলেন। আমাদের সময়ে ‘বঙ্গদেশী বাক্য অনুসরণ করিয়া’—এই বাংলায় এলেন মুজিব, মোজিবর, শেখ মুজিব, শেখ সাহেব থেকে বঙ্গবন্ধু। এর পরের ধাপ সবাই জানেন, তিনি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার স্থপতি; সর্বোপরি তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলার মহানায়ক।

এসব অভিধা, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত রচনায়, অলোচনায় প্রচল এবং প্রবল। এসব মহতি অভিধাগুলোর পরতে পরতে লেপ্টে আছে বাঙালি জাতির নবঘন শ্যামশস্য তরুময় দুঃখতাপদগ্ধ প্রাণের ক্ষোভ উদ্ভূত রক্তাক্ত আন্দোলন, মারাত্মক হতাশার দীর্ঘশ্বাস আর পোড়খাওয়া জীবনের আর্তযন্ত্রণার ধ্বনি। ভাতে মাছে বাঙালির ঘরে সেদিন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’—প্রবাদবাক্যটি তার সচিত্র প্রতিধ্বনি।

এমন গুঞ্জরিত বেদনার ধ্বনির ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর পদধ্বনি শুনে জাগ্রত হয়েছে, আমাদের সাড়ে সাত কোটি নিষ্পেষিত প্রাণ। ১৯৪৮ সালের প্রথমভাগেই, এই বাংলায়; তাঁর পরিচয়, হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর উচ্চ দৃষ্টির সম্পাত এবং তাঁর আপনকার আত্মক বোধের প্রান্তস্পর্শী মুক্তির বীক্ষণ আলাদা অনুভবে জাগ্রত হতে থাকে; মাত্র মুজিব নামের মধ্যেই।

ভাষা আন্দোলনের ঘাত-প্রতিঘাত আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আপসহীন অটল মনোভাব প্রদর্শনের মধ্যেই মুজিব জানান দিতে সক্ষম হন, তিনি [মুজিব] আলাদা কিছু, অন্যকিছু। দূরপ্লাবী তাঁর চিন্তার স্তর বাইগার বিল থেকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার উছলানো বাঁক।

আমার অতিক্ষুদ্র অনুভব, এই বাঁক থেকেই মূলত তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের উত্তরণচিহ্ন; মুক্তির ময়দানে সৈনিকের হাতে খাপখোলা তরবারির মতন ঝকঝক করতে থাকে; বাঙলার আকাশে চমকায় শেখ মুজিবের গৌরবর্ণদেহ ও মনন।

বিনত স্বরে বলব, বিভ্রান্তিতে আড়ষ্ট হব বলে, এ ক্ষুদ্র লেখায়, বঙ্গবন্ধুর বাল্যজীবন এবং ভারত মুক্তির আন্দোলনের অংশ এখানে বিবৃত করতে অপারগ। আমার অন্বেষণ দর্শনগত…।

গৌর যেমন দু’বাহু তুলে তাঁর দেহভঙ্গিমার অমন ধানুকি নয়ন বানের দৃষ্টি ফেলে ফেলে চকিত চরণে, চরণ রেখার রেখায় দুলে উঠে আন্দোলিত করে গেছেন পল্লীমার নিঃস্বপ্রাণ। বঙ্গবন্ধুও অমন দিব্যময়তার রাঙাহাত তুলে, বাঙ্ময়ধ্বনির ধানুকিস্বরের কণ্ঠদোলায়; এই বাঙলার নিঃস্ব কুটিরবাসীরে জাগিয়ে তুলেছেন; কী এক যুক্তির প্রকৌশলী দোলায়। তাঁকে যিনিই দেখেছেন তাঁর মধ্যে অকস্মাৎ আমূল পরিবর্তন এসেছে [বঙ্গবন্ধুর ওপর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ-কথা সবার রচনাতেই সুলভ]।

শুধু কী এই, সেদিনের ধুলো-মাটি-ঘাস-লতা-পাতা-কাদা-জল, নদীর বাঁক, চৈত্রের খরখরে নাড়ামাঠ, বর্ষার পিছলাপথ, পানের বরজ, হাওড়-বাওর, আঁড়া-পাথার, বাঁশঝাড়, কোণা-কাঞ্চি তার ল্যাম্প জ্বালা বসতির ছাতি-মাথুল, কাঁচি-পাঁচুন-বাঙ, ঢেঁকিরপাড়, কাক-কোকিল-শালিক-দোয়েল, ঘুঘু-ময়না, ময়নার ডাক; দীঘিনালার পাহাড়, কেওড়া কেডাং, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণার ধবধবে ধারা কী এক অমৃতসুধায় প্রাণের তরে প্রাণ ক্রমাগত উচ্চ থেকে উচ্চতর হয়েছে; বক্ষপ্রসারিত হৃদয়ভরা হৃদয়ের সুকোমল উত্তাপ।

প্রকৃতি আপন সত্তার ভেতর খুঁজে পেয়েছে তার আপন মানুষ। যে মানুষ বাউলসম্রাট লালন খুঁজেছিলেন, ‘আমি কোথায় পাব তারে…।’ যে তাদের সমূহ ধ্বংসের হাত থেকে, বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করে যাবে, সৃষ্টির শাণিতশক্তি উঁচিয়ে।

আর বাঙলা মায়ের বর্ণমালা, পুঁথি-নথি-খুঁতি আর তার নিশুতি রাতের মতন প্রত্নজ্যোতিও পেয়েছে বর্ষার ঢলের ওপর স্রোতশীল মহাগতির ভুবনমোহন উদ্ভাসন। বিগত শতকের ষাটের দশকের ভাষা-কাব্য-সাহিত্য-কথা-কাহিনী, চিত্রনাট্য তার সংলাপ তারই প্রোজ্জ্বল স্বর।

এ এক প্রাণবন্ত সময়। এ সময় আমার পিতামহীর ‘গঙ্গে চ যমুনেচৈব গোদাবরী সরস্বতী নর্মদে সিন্ধু কবেরী’—চিরন্তন আত্ম-চিত্তশুদ্ধির আচমনের মন্ত্রটিও হয়ে উঠলো আমাদের গণচৈতন্যের আলোকে কেমন সুন্দর সাবলীল এবং সর্বজনীন এবং গগনবিস্তারী সার্বভৌম সত্তার জনধৌত অগ্নিমন্ত্র : ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা।’

এ যে ভাষার বিবর্তনে ভাষা, ছন্দের বির্বতনে ছন্দ, চেতনার বির্বতনে চেতনার তরঙ্গ। সর্প যেন সর্পফণা তুলে দাঁড়াল, নদী যেন প্রবল বেগে হলো সমুদ্রগামী। সমুদ্রও যেন এমন অপেক্ষায় ছিল কাতর ও অস্থির।

একই সঙ্গে স্বাদেশিক চেতনায় সমুজ্জ্বল, নাভীদ্গোমিত স্লোগান : ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা।’ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’—এ স্লোগান তোলার সময়ে আমাদের কণ্ঠ, আমাদের দেহের ভাঁজ হতো টানটান যেন প্রতিকুল স্রোতের বিপরীতে নৌকার গুণটানা মাঝি আমরা। কেন? তা হলো : ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়/ দুখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়…।’

হাওল্যা-জাওল্যার পোলার প্রাধান্যে বঙ্গবন্ধু ধন্য এবং অগ্রগণ্য। সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, শোষণ যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরাই তাঁর ছয় দফা প্রতিষ্ঠার তূর্য-অস্ত্র।

আইয়ুব-ইয়াহিয়ার কূটচক্রান্তের বিরুদ্ধে সদ্যচরের মতন জেগে ওঠা কয়েকজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, হাতেগোণা কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক-প্রকৌশলী, আইনবিদও তিনি পেয়েছেন; পেয়েছেন ক্রোধোদীপ্ত কবি শিল্পী-সাহিত্যিক। এ নিয়েই তাঁর পথচলা।

এ যেন ‘একলা চলো, একলা চলো’ নীতির রবীন্দ্রনাথের মতন মাথা তোলা তাঁর ডাক : ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই, আমার সোনার হরিণ চাই…।’ হরতাল, ধর্মঘট, পোস্টার, লিফলেট, মিছিল মিটিং, মশাল মিছিলে যুক্তির বিস্তারে জাগ্রত হাট ঘাট নগর ও বন্দরের বটতলায় পাওয়া যায়, বিপ্লব আর গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের পাঠ।

এ পাঠ থেকে বলব : ‘মার্কসবাদী তত্ত্বের সবচেয়ে পাথুরে বুনিয়াদের ওপর যেমন বলশেভিকবাদের উদয় হয়েছিল’ ঠিক তেমনই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যয়দীপ্ত ছয় দফার ইস্তেহারের সঙ্গে বাঙালির মানসচেতনার ওপরই উদিত হয়েছে বাংলাদেশের পতাকা। বঙ্গবন্ধু নিজে দেশ এবং দেশবাসীর মুক্তির সুনির্দিষ্ট তীরে দাঁড়িয়ে নিজেকে একজন ‘খাদেম’ ভাবতেন। ছয় দফার যুক্তি-বিস্তারি রচনায় তিনি লিখেন : ‘আপনাদের খাদেম শেখ মুজিবুর রহমান।’ এ হলো ইতিহাসের সম্বল।

(চলবে)

…………………

পড়ুন

কবিতা

ও ভাই : প্রদীপ মিত্র

প্রদীপ মিত্রের দুটি কবিতা

প্রদীপ মিত্রের হাওয়ার ঢেউ

মতামত

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা

বঙ্গবন্ধু : দর্শনগত চর্চার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা – ২য় পর্ব

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%