মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯সত্য-সুন্দর সুখ-স্বপ্ন-সম্ভাবনা সবসময়...

গল্প

এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প
গল্প, বিশেষ প্রথম, সাহিত্য

এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প

এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প সুনীল শর্মাচার্য এক সমাজবিরোধী ও টেলিফোনের গল্প ওসি মদনবাবুর যেমন রঙ, তেমনি স্বাস্থ্য। যাকে বলে—যেমন হাঁড়ি, তেমনি সরা। কলাগাছের মতো মসৃণ হাত পা। সব গোছগাছ সেরে এটাচিটা পাশে রেখে, লকাপের চাবিটা পকেটে পুরে গ্যাঁট হয়ে বসলেন চেয়ারে। মদনবাবুর বয়স তিরিশ। সমাজবিরোধীদের যম। কিছু কাঁটা ঝোপ সাফ করার দূরন্ত প্রতিজ্ঞা তার মনে। চাইবাসা থেকে সদ্য এসেছেন। চার্জ নিয়েই কয়েক ঘণ্টা মশার কামড় খেয়ে কানামুন্নাকে ধরে লকআপে ভরেছেন। আরাম করে সিগারেট ধরিয়ে বয়স্ক সিপাই করিমকে জিজ্ঞাসা করলেন, এতদিন শয়তানটাকে ধরা হয়নি কেন? ধরে তো কোনো ফায়দা নেই স্যার! ছোটবাবু অযাচিত উপদেশ দিয়ে গেলেন, কাজটা ভালো করলেন না স্যার! ছোটবাবু বের হতেই, ফোন এসে গেল—কড়া কণ্ঠস্বর : মুন্নাকে ছেড়ে দিন। সে সমাজবিরোধী! এ যুগে সমাজবিরোধী নয় কে? ছেড়ে দিন। তার বিরুদ্...
উকিল ডাকাত
গল্প, সাহিত্য

উকিল ডাকাত

উকিল ডাকাত সুনীল শর্মাচার্য উকিল ডাকাত উকিলের সন্ধানে এসেছিলেন প্রভাসবাবু। কিছু আইন সংক্রান্ত বিষয় আলোচনার জন্যে। উকিল বাবু কথান্তরে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : বাড়ি কোথায়? কাকীনাড়া। তাহলে তো আপনি রুস্তম ডাকাতকে চেনেন? চেনবো না কেন? চুরি, ডাকাতি, নারী ধর্ষণ, খুন জখমে উস্তাদ; বাঘ-সিংহের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এখন তো জেলে। জানেন, ওর স্ত্রী এসে খুব কান্নাকাটি করছে। হাতে পায়ে ধরছে। বলছে খালাস করে দেন, আপনার সমস্ত ফিজের তিনগুণ দিয়ে দেবে। মনে মনে ভাবেন প্রভাসবাবু, রুস্তম ডাকাত পারে না—এমন কর্ম তো নেই, তিনগুণ কেন, দশগুণও দিতে পারে। জেলের বাইরে এলেই—আর ভাবনা কি... হা মশায়, তা লোকটা কেমন? বললেন তো ডাকাত! না, মানে শেষ পর্যন্ত কথা রাখবে তো? কথা না-রাখলে ওরই বিপদ, আবার তো ওকে জেলের ভেতরে আসতেই হবে। হ্যাঁ—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। মোটা টাকা মশায়, কেসটা চালিয়েই দি, আ...
শেষ অধ্যায়ের আগে
গল্প, বিশেষ প্রথম, সাহিত্য

শেষ অধ্যায়ের আগে

শেষ অধ্যায়ের আগে জেবুননাহার জনি . রায়হান এই প্রথম সিয়ামকে নিয়ে একা ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে। বাবা-ছেলে মিলে লাগেজ গোছগাছ করছে। সাত বছরের সিয়াম একটু পর পর দৌড়ে গিয়ে তার এক একটি ড্রেস আনছে আর বাবাকে দিয়ে বলছে, বাবা আমার এই ড্রেসটা নিয়ে নাও। আমার লাগবে। রায়হানও সিয়ামের ড্রেসগুলো লাগেজে ভরে নিচ্ছে। এভাবে একসময় দেখা যায় সিয়ামের কাপড়েই লাগেজটি ভরে গেছে। নিজের কাপড় নেবার আর জায়গা নেই লাগেজটিতে। রায়হান ভাবতে থাকে—কোথাও বেড়াতে গেলে সবসময় নিরুপমা কত সুন্দর করে সবার কাপড় গুছিয়ে লাগেজে ভরে নেয়। অথচ রায়হান এই সামান্য কাজটি করতেও হিমশিম খাচ্ছে। রায়হান হঠাৎ খেয়াল করলো সিয়াম খাটের উপরে আগোছালো কাপড় হাতে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর বিছানার চারিদিক দিয়ে ছড়ানো খেলনা, জুতো, জামাকাপড়। বেড়াতে যাবে চার-পাঁচ দিনের জন্য। আর ছেলে রাজ্যের জিনিস নেবার বায়না ধরে আ...
বাংলা
গল্প, বিশেষ প্রথম, সাহিত্য

বাংলা

বাংলা অভিজিৎ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ’ তখনো নাম হয়নি। সবাই বলতো—পূর্ব পাকিস্তান। মেজ পিসি চিঠিতে লিখতো—এবার শঙ্খ নদীতে বান এসেছে। ঘর-দোর সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আবার মেজ পিসি কয়েক মাস পরেই লিখতো—আমরা ভালো আছি, ‘মা’। আমার কাজ ছিল ঠাকুরমাকে পিসির চিঠি পড়ে শোনানো। চিঠির অন্তঃস্থলে কিছু থাকলেও, আমাকে স্পর্শ করতো না। আমি অনেক অংশ বাদ দিয়ে পড়ে গেলে—ঠাকুরমা টের পেয়ে যেতো। অন্য কাউকে দিয়ে চিঠিটা পড়াতো। কখনো কখনো শুনতাম পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাটাই থাকবে না। সবাইকে উর্দু ভাষায় লিখতে, পড়তে হবে। বাবাকেও অবশ্য হিন্দি আদ্য, মধ্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে—সরকারি চাকরি রক্ষা করতে, যদিও বাবা মনে-প্রাণে হিন্দি ভাষাকে ঘৃণাই করত মনে হয়। ‘হিন্দি’ ভাষা হিসেবে ক্লাস এইট অবধি আমরাও পড়েছিলাম। বিস্তর নম্বর পাওয়া যায়। আর বিচিত্র সব শব্দকে স্ত্রী-লিঙ্গ হিসেবে ধরা হয় । উর্দু দূর থেকে দেখেছ...
বানকিনার রক্তপঞ্জি : রাশেদ রহমান
গল্প, বিশেষ প্রথম, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, সাহিত্য

বানকিনার রক্তপঞ্জি : রাশেদ রহমান

বানকিনার রক্তপঞ্জি রাশেদ রহমান গ্রামের নাম বানকিনা...। হাশড়া, কালোহা, পাইকড়া, রোয়াইল, মৌরি—এই পাঁচটি গ্রাম বানকিনাকে ঘিরে রেখেছে। মাঝখানে বানকিনা। ছ’টি গ্রামই দ্বীপসদৃশ। বছরের অন্তত সাত-আটমাস গ্রামগুলো কচুরিপানার মতো জলে ভাসে। সব বাড়ির ঘাটে ডিঙ্গি নৌকা বাঁধা। নৌকাই এই দ্বীপ-গ্রামগুলোর মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। অঘ্রান-পৌষ মাসে এইসব গ্রামের কাঁচা রাস্তা কি হালট জেগে ওঠে। চার কি পাঁচমাস এই পথে ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ তুলে গরুরগাড়ি চলে...। থানা-সদর থেকে বহুদূরের গ্রাম বানকিনা, হাশড়া, কালোহা, পাইকড়া, রোয়াইল ও মৌরি। নামা ভূমি। কিন্তু গ্রামগুলো উঁচু টিলার মতো। নামা-অঞ্চলের গ্রাম এরকমই হয়। না-হলে বর্ষার জল উঠে যাবে যে বাড়িতে! বর্ষার জল যতোই বাড়ুক—বানকিনা, হাশড়া, কালোহা, পাইকড়া, রোয়াইল, মৌরির কোনো বাড়িতে জল ওঠে না...। কিছুটা দূরে দূরে সব বাড়ি। একেবারে গা ঘেঁষ...
বন্ধুত্ব : বিশ্বজিৎ দাস
গল্প, সাহিত্য

বন্ধুত্ব : বিশ্বজিৎ দাস

‘তুই কে? ঠিক করে বল।’হিসহিস করে বলল উত্তম। তার সামনে বসে থাকা তরুণটি হাসল। ‘আমি সৌমিক। তোর ক্লাসমেট।’ ‘ক্লাসমেট! উড়ে এসে জুড়ে বসে এখন বলছিস তুই আমার ক্লাসমেট!’ ‘আহা! চটছিস কেন। উড়েই আসি আর জুড়েই বসি, আসলে আমি তোর আর সাথীর ক্লাসমেট। বন্ধু।’ ‘আর বাকিরা? ওরা তোর ক্লাসমেট নয়?’ ‘আমরা সবাই ক্লাসমেট। তবে তুই আর সাথী হচ্ছিস আমার ঘনিষ্ঠ ক্লাসমেট।’ ‘মোটেও না। আমি তোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু না। সাথীও না।’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল উত্তম। ‘তুই এত ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন? অবশ্যই তুই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’ হেসে হেসে বলল সৌমিক। ‘তুই যদি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হোস, তাহলে আমি অন্তত জানতাম—তুই কে, কোথায় তোর বাড়ি, আর কোথায় থাকিস তুই।’ ‘জানবি। অত তাড়া কীসের!’ শান্ত ভঙ্গিতেই বলল সৌমিক। মাত্র দিন পনেরো আগের কথা। উত্তমের মনে পড়ল, ক্যান্টিনে বসে গল্প করছিল ও আর সাথী। তখনো নাস্তার অর্ডার দেয...
ডাকপিয়ন ও অশ্বত্থ বৃক্ষ : ফকরুল চৌধুরী
গল্প, সাহিত্য

ডাকপিয়ন ও অশ্বত্থ বৃক্ষ : ফকরুল চৌধুরী

ন্যাড়া মাথা এক মান্দার গাছের নিচে লোকটা নিজেকে সমর্পণ করে, ধরফরায়। দেহে তপ্তকুচি চিনচিন হুল কাটে। ভূমিতে ডালপালার ছায়াজালিকার ছাপ, শরীরেও ছায়ানকশা। মনের আহ্লাদ বাড়ে। সিসাগলা গরমে এই যেন স্বর্গসুখ। চারদিকে গরমকুণ্ডের সুবিশাল প্রান্তর। মরীচিকার ফাঁদ, এদিক সেদিক। ডাকপিয়ন পিঠে রাখা চটের ঝোলাটি অভ্যাশবশত আঁকড়ে আছে। ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শরীর ফুঁড়ে ঘাম ঝরছে। ফোটা ফোটা শিশির গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। শরীরে বাতাসের আরাম পরশ। একটু কেঁপে ওঠে। নিজের অবস্থান বিষয়ে সচেতন হয়ে বুঝতে পারে ছোট্ট এক বৃত্তে আটকে পড়েছে। বৃত্তভাঙা মানে নরকের স্পর্শজ্বালা। তখন দূরের অশ্বত্থ নজরে আসে, যেন ঝাকড়া চুলের বিদ্রোহী কবি নজরুল। পাতার ঢেউ খেলা এখান থেকেও চোখে পড়ে। মরিচিকার ধাঁ ধাঁ বৃক্ষের মাথায় চিক চিক করছে। কখনো মনে হয়, গলানো সিলভার পাতায় লেপ্টে আছে, গড়িয়ে গড়ি...
লাল কাঁকড়া : ধ্রুব এষ
গল্প, সাহিত্য

লাল কাঁকড়া : ধ্রুব এষ

লাল কাঁকড়া : ধ্রুব এষ নাইবউদ্দিন বিক্রি হয়ে গেছেন। দশ হাজার টাকা রফায় তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বিক্রি যে করেছে, উটকো কেউ নয়, তাকে কানাশ্যাল ডাকে তার লোকেরা। প্রকৃত নাম আবু সুলেমান। তার লোকেদের ধারণা, সে কানা শেয়ালের মতো চতুর। সে নিজেও মনে করে এটা। এবং কানা শেয়াল ভাবে নিজেকে। কানা শেয়াল থেকে কানাশ্যাল। আর মাত্র এক… না, দুই… দুইটা মিনিট পেলে সে তার নামের মাহাত্ম্য দেখাতে পারত। কিন্তু আজ শনিবার বলে রাস্তাঘাট ফাঁকা। প্রেসক্লাব থেকে একটানে বাস শাহবাগে চলে এসেছে। এই এলাকা তার এখতিয়ারে না। বাধ্য হয়ে ধরা মুরগি বিক্রি করে দিতে হয়েছে। আফসোস! তবে দশ হাজার টাকা সে পাবে। শাহবাগ এলাকার থানেদার গাইট্টা। সে আরও বড় রুস্তম। গাইট্টা, কারণ তার গিঁটে গিঁটে প্যাঁচ। আট প্যাঁচ দিয়ে ধরে মুরগিকে। এমনিও বিটল কম না। বলেছে, ‘পাললি না! কানাশ্যাল হয়েও পাললি না! এহ্-হে-হে-হে! এহ্-হে-হে-হে!’ ...